কমনওয়েলথ গেমসে একটি ক্রীড়াদল মানে শুধু মাঠে নামা কয়েকজন অ্যাথলেট নয়। তাদের সঙ্গে থাকে দায়িত্ব, শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতা। কিন্তু গ্লাসগোয় বাংলাদেশের দলের চিত্র উল্টো। খেলোয়াড়রা মাঠে, আর কর্মকর্তাদের একাংশ নিজেদের সুবিধামতো সফরসূচি সাজিয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বাংলাদেশ দলের আন্তর্জাতিক মিশন, নাকি ব্যক্তিগত বিদেশ সফর?
বাংলাদেশ সাঁতার দল আজ দেশে ফিরে গেছে। অথচ দলের ম্যানেজার আতিকুর রহমান সাঁতারুদের সঙ্গে ফেরেননি। তিনি গ্লাসগোতেই থেকে গেছেন। তার দেশে ফেরার কথা ৬ আগস্ট। দায়িত্ব শেষ, খেলোয়াড়রা দেশে, ম্যানেজার বিদেশে।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) এ বি এম শেফাউল কবিরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আতিক নিজের খরচে থাকছেন।’ প্রশ্নটি তো খরচের নয়।
প্রশ্ন হলো, দলের ম্যানেজার কি খেলোয়াড়দের দেশে পাঠিয়ে নিজে বিদেশে থেকে যেতে পারেন? খেলোয়াড়রা যখন দীর্ঘ ভ্রমণে দেশে ফিরছেন, তখন তাদের দায়িত্ব কার? শেফাউল কবিরের কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে ম্যানেজারের ভূমিকা শুধু মাঠের নয়। বিমানবন্দর, ট্রানজিট, লাগেজ, চিকিৎসা, আনুষ্ঠানিকতাসহ পুরো সফরের দায়িত্ব তার কাঁধেই থাকে। সেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার আগেই যদি ম্যানেজার নিজের পথ আলাদা করে নেন, তাহলে সেটি নৈতিকতার প্রশ্নও।
এটাই আবার একমাত্র ঘটনা নয়। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স দলের প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। শুক্রবারও ট্র্যাকে বাংলাদেশি অ্যাথলেট নামবেন। অথচ দলের ম্যানেজার শাহ আলমকে বুধবারই দেশে ফিরে যেতে হয়েছে। তার ফিরতি টিকিট সেভাবেই কেটেছিল বিওএ। প্রশ্ন উঠছে, যে দলের খেলা শেষ হয়নি, সেই দলের ম্যানেজারের টিকিট মাঝপথে কেন কাটা হয়েছিল? এই প্রশ্নেরও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আরও বিস্ময়কর, বুধবারই গ্লাসগো ছেড়ে দেশে ফিরে গেছেন বাংলাদেশ দলের সেফ দ্য মিশন সাইফুল ইসলাম। যে ব্যক্তি পুরো দলের সমন্বয়ের দায়িত্বে, তিনি ফিরে গেছেন দলের সব ইভেন্ট শেষ হওয়ার আগেই।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন শেষ দৌড়, শেষ লড়াই, শেষ স্বপ্ন
-6a6c5c6217743.jpg)
ফলে অদ্ভুত এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দল গ্লাসগোয়। অ্যাথলেটরা প্রতিযোগিতায়। কিন্তু দলনেতা ঢাকায়। একদিকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে থাকার কথা যাদের, তারা নেই। অন্যদিকে যাদের ফেরার কথা ছিল দলের সঙ্গে, তারা থেকে যাচ্ছেন নিজের পছন্দে।
এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিরল। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও দেশের জন্য লড়াই করেন। কেউ ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং করেন, কেউ নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন। তাদের ঘিরে থাকা কর্মকর্তারা এলোমেলো।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস বাংলাদেশের জন্য পদকের উৎসব হয়ে ওঠেনি। এই সফর অন্তত পেশাদার ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হতে পারত। বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন ছবি।
কোথাও ম্যানেজার নেই, কোথাও ম্যানেজার অতিরিক্ত সময় বিদেশে। কোথাও দলের খেলা শেষ হওয়ার আগেই কর্মকর্তা দেশে। সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেন একেকজনের একেকটি ব্যক্তিগত ক্যালেন্ডার। জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক সফর কি এভাবেই পরিচালিত হওয়ার কথা?
কমনওয়েলথ গেমস কোনো পিকনিক নয়। এটি রাষ্ট্রের পতাকা বহন করার মঞ্চ।