ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯ জুলাই শেষ হয়। এবার যুক্তরাষ্ট্র ছিল এর অন্যতম আয়োজক। যে দেশটির সঙ্গে যুদ্ধ করছে, সে দেশে গিয়েই এবার ইরান খেলেছে। তারা প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো-বিশ্বকাপের একটি ম্যাচেও হারেনি ইরান। নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসর-তিন শক্তিশালী দেশের সঙ্গে তারা ড্র করে। কার্যত ইরান খেলার মাঠে অপরাজেয় মনোভাব দেখিয়েছে। আর এটা তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। প্রতিপক্ষের মাটিতে এ লড়াকু মনোভাবের মাধ্যমে ইরান একটি প্রতীকী বার্তাও দিয়েছে। সেটা হলো-ইরান হয়তো জিতবে না, কিন্তু হারও মানবে না।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও মিনাবে স্কুলের ১৬৮ শিশুকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেটি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গলায় আটকা হাড়ে পরিণত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে নজিরবিহীনভাবে ক্ষতির মুখে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা। বার্তা সংস্থা এপি জানায়, সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে সব সেনা সরিয়ে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেও সেনা প্রত্যাহার চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স্ট পোস্ট অনলাইন জানায়-কাতার, সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলো থেকেও ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে ইসরাইলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২১ জুলাই কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে হতাহত বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বিষয়টিকে সাদামাটাভাবে দেখলে ভুল হবে। এটা ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে লেজ গুটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পালানোর দৃশ্য। একটি পরাশক্তিকে কীভাবে ভড়কে দিল ইরান? তার শক্তি-সামর্থ্যরে রহস্য কোথায় লুকিয়ে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, তিনি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র বানাতে দেবেন না। ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ইরান বলছে, তারা পরমাণু অস্ত্র বানাবে না। এ অস্ত্র বানাতে প্রয়োজন ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। তারা সেটা করবে না। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিও পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এক সাড়া জাগানো প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এ ধরনের অস্ত্র তৈরিতে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির আগ্রহ রয়েছে।

অনেকে বলেন, আলোচনা যা-ই হোক-ইরান হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিষয়টি এমন এক ধাঁধা তৈরি করেছে, যা ইরানকে বড় ধরনের সুবিধাই দিচ্ছে। এ রহস্যময়তা পরমাণু অস্ত্রধারী হওয়ার চেয়েও বড়। কারণ, এর কারণে প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ইরান তাদের দোদুল্যমান অবস্থায় ফেলেছে। তারা ভাবছে- ইরান হয়তো পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলবে, অথবা বানিয়ে ফেলেছে। এটা তাদের মধ্যে দ্বিধার সঞ্চার করছে।

ইরানের শক্তিমত্তার নেপথ্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। সেটি হলো-তাদের ভৌগোলিক অবস্থান। পারস্য উপসাগরের তীরে দাঁড়ানো পাহাড়-পর্বতে ঘেরা দেশটি যেন প্রকৃতির সৃষ্ট দুর্গ। এ কারণে কোনো দেশের পক্ষে সেখানে স্থল অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি মার্কিন সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন-‘আমরা তাদের (মার্কিন সেনা) অপেক্ষা করছি।’

তবে এসবের বাইরে আক্ষরিক অর্থেই ইরানের ভালো সক্ষমতা রয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র অত্যাধুনিক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালাতে সক্ষম। এক্ষেত্রে অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে সরাসরি প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত নিশ্চিত করে সহায়তা করছে রাশিয়া ও চীন। অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেল কিনে চীন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানের অর্থনীতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে যাচ্ছে। এ দুই দেশ কূটনৈতিক সমর্থনও দিচ্ছে।

সম্প্রতি রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঁধে বহন করে চালানো যায় এমন বিশেষ ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে দিতে যাচ্ছে চীন। ইরান ও রাশিয়ার মাঝখানে রয়েছে ক্যাস্পিয়ান সাগর। দুই দেশ সহজেই সেখান দিয়ে ভারী অস্ত্র আনা-নেওয়া করতে পারে।

ইরানের আরেকটি শক্তির কথা অনেকেই উহ্য রাখেন। সেটি হলো-দেশটির অসাধারণ কূটনীতি। পশ্চিমা গণমাধ্যমে নানা অপপ্রচারের পরও ইরান বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই গ্রহণযোগ্য। এজন্য দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের কৃতিত্ব অনেক। অপরদিকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুগে ইসরাইল কার্যত একঘরে হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও ভারত ছাড়া তেমন কোনো দেশ আর তাদের পাশে নেই।

তবে সবকিছু ছাড়িয়ে ইরানের বড় শক্তিমত্তার উৎস হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। এটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এসেছিল ইসরাইলের হয়ে লড়তে, এখন নিজেদের লড়াই চালিয়ে যেতেই হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, হয়তো এটি মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের যুদ্ধ। এরই মধ্যে মহাপরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, পরাশক্তি-যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে এ ধরনের যত বিশেষণ ব্যবহার করা হতো, সেগুলো এখন ভূলুণ্ঠিত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews