দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যেই বর্ষা শুরু হওয়ায় দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। এই দুই সংকট একসঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট আরো তীব্র হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩৯ জনের। হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯৬৮ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৫১ জন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৭ হাজার ২৬২ জন রোগী ভর্তি হয়। এই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ৮৩ হাজার ৫৪৩ জন ছাড়পত্র পায়। অর্থাৎ গতকাল সারা দেশে তিন হাজার ৭১৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এর আগে ৩ মে সারা দেশের হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল তিন হাজার ৪৫০ জন।

অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাম বা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে এক লাখ ১৬ হাজারের বেশি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। শুধু জুন মাসেই হামে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগী ছিল ৩৩ হাজার ৬৬ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ৭৪১ জন, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯২৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭২৯ জনের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা প্রত্যাশিত হারে কমছে না। রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্তদের আলাদা আইসোলেশনে রাখতে হয়, যা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বাড়তি জটিলতা তৈরি করছে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে সংক্রমণও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে সমন্বিতভাবে মশক নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কোথায় ও কেন ডেঙ্গু বাড়ছে, তা জানতে শক্তিশালী নজরদারি ও গবেষণা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক ভিটামিন-এ ও টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়েছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। এই বড় জনগোষ্ঠী টিকার বাইরে থাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরো বাড়ানো জরুরি।

হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে : রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতাল গত বছর সাত হাজার ২০৫ ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছিল। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এটিকে একটি বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে রূপান্তর করার পর থেকে এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রূপান্তরের আগে হাসপাতালটি ৮১ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করেছিল।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি তলায় হামের রোগী রয়েছে, তাই আমরা এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করতে পারছি না। যদি কোনো ডেঙ্গু রোগী হামে আক্রান্ত হয়, তবে তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হতে পারে। হাসপাতালটি এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮৪ জনকে হামের চিকিৎসা দিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৮৬।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট গত বছর ৯১৭ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করেছে। ৬৮১ শয্যার এই হাসপাতালটি বর্তমানে গুরুতর হামের রোগীদের জন্য একটি প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালটি এক হাজার ৪৮৭ জনকে হামের চিকিৎসা দিয়েছে। এখনো ভর্তি ৯৯ রোগী। 

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম গতকাল বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের চাপ না থাকলে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া আরো সহজ হতো। তবে আমরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ডেঙ্গু রোগীদের সংকুলানে হাসপাতালে একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে।

দেশের বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত বছর তিন হাজার ৭২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নেয়। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বর্তমানে ৫০ শয্যার একটি নির্ধারিত ওয়ার্ড রয়েছে।

বর্ষায় বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি : এদিকে বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ছয় হাজার ৪৫৮ জন। এর মধ্যে শুধু জুনেই ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৯০৭ জন, যা মোট রোগীর ৪৮ শতাংশ। এ বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৭২ শতাংশই জুনে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জুলাই ও আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিতে পারে। ফলে হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপ সামলাতে থাকা হাসপাতালগুলোকে একই সময়ে ডেঙ্গুর বাড়তি রোগীও মোকাবেলা করতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, হামের সংক্রমণ কিছুটা কমলেও প্রত্যাশিত হারে কমছে না। বর্ষাকালে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ায় ডেঙ্গুও দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। দুটি রোগ একসঙ্গে হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় রোগীদের আলাদা আইসোলেশনে রাখতে হয়। ডেঙ্গুর জন্যও পৃথক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ফলে হাসপাতাল পরিচালনা আরো জটিল হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অস্থায়ী ডেঙ্গু ইউনিট চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর বড় ধরনের বিস্তার ঘটতে পারে। বিশেষ করে বরিশাল, চট্টগ্রামসহ ঢাকার বাইরের জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এখনই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিধন ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

সরকার কী করছে? : এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যা, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোকে মশক নিধন কার্যক্রম আরো জোরদার করার আহবান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী চাপ মোকাবেলায় শুধু হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; টিকাদান, মশক নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় বর্ষার বাকি সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরো বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

বিডি প্রতিদিন/নাজিম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews