সাভার, গাজীপুর, ফতুল্লা ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের শত শত ডাইং, ওয়াশিং ও রাসায়নিক কারখানা বিষাক্ত বর্জ্যে ভয়ানক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। কেমিক্যাল ডাম্পিং ও ইটিপি ফাঁকির ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন ঢাকার কোটি মানুষ। খরচ বাঁচাতে তরল বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট বা ইটিপি ব্যবহার না করার জন্য কারখানাগুলোর বিষাক্ত ভারী ধাতু এখন টিউবওয়েলের পানিতেও মিশে যাচ্ছে। ফলে বিষাক্ততার ঝুঁকিতে পড়েছে ঢাকার চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার ভূগর্ভের সুপেয় পানি। ভারী ধাতুর বিষক্রিয়ায় ক্যান্সার, কিডনি বিকল এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাঁচ কৌশলে ইটিপি ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। এতে ভূগর্ভের পানি ছাড়াও শিল্পায়ন এলাকার ধান, আলু ও বেগুন এমনকি ঘাস খাওয়া গরুর দুধেও ক্ষতিকর মাত্রায় ক্রোমিয়াম ও সীসা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পানি ফুটিয়ে পান করলেও খাবারের মাধ্যমে এই বিষ শরীরে ঢুকছে। এতে মানুষের অঙ্গহানি, ক্যান্সার, মস্তিষ্কের ক্ষতি, ত্বক ও স্নায়ুরোগসহ মরণব্যাধি রোগের ভয়াবহতা দেখা দিচ্ছে।
গত ছয় বছরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ অধিদফতর, বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদফতরের পৃথক গবেষণা প্রতিবেদনে এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ২০০০ সাল থেকে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের মতো উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল এবং সাভার ও টঙ্গীর শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভস্থ পানির প্রধান স্তর বা অ্যাকুইফারে প্রবেশ করছে। হেমায়েতপুরের ট্যানারি বর্জ্য ধলেশ্বরী নদী ও সংলগ্ন অঞ্চলের মাটিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ডাম্প করা হচ্ছে। টঙ্গী ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চল এখানকার টেক্সটাইল, ডাইং এবং ওষুধ কারখানাগুলোর রাসায়নিক বর্জ্য খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা হয়। অন্য দিকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হাজারীবাগ ট্যানারির ভারী ধাতুর বর্জ্য বুড়িগঙ্গার তলদেশে জমা হয়ে একটি স্থায়ী বিষাক্ত স্তরে পরিণত হয়েছে।
সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে ঢাকার চারপাশের অগভীর ও গভীর নলকূপের পানিতে ক্রোমিয়াম, সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো মারাত্মক ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলছে। এতে বলা হয়, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার পানির স্তর প্রতি বছর অত্যন্ত দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা বর্তমানে স্থানভেদে ১৪০ থেকে ১৬০ ফুট বা তারও গভীরে চলে গেছে।
গবেষণায় বলা হচ্ছে, পানির স্তর নিচে নেমে শূন্যতা তৈরি হওয়ায় মাটির ওপরের বিষাক্ত রাসায়নিক ও নদীর দূষিত পানি আরো দ্রুতগতিতে নিচের দিকে বা গভীর অ্যাকুইফারে শোষিত হচ্ছে। উন্মুক্ত ডাম্পিং জোন এবং অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য ঢাকার মাটির নিচের পানির স্তরকে বিষাক্ত করছে। ভারী ধাতু মিশ্রিত এই পানি পানের ফলে মানুষের শরীরে ক্যান্সার, কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের ক্ষতি এবং চর্মরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। দূষিত ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে ফসলে সেচ দেয়ায় উৎপাদিত শাকসবজি ও খাদ্যেও এই বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়ছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, হাজারীবাগের দীর্ঘদিনের ট্যানারি বর্জ্যরে কারণে আশেপাশের ঢাকা ওয়াসার গভীর ও অগভীর নলকূপের পানিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ক্রোমিয়াম ও সালফাইড পাওয়া গেছে। বুয়েটের আইডব্লিউএম আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের চারপাশের ভূগর্ভস্থ পানিতে বিষাক্ত লিচেটের অনুপ্রবেশ এবং ক্লোরাইড ও অ্যামোনিয়ার উচ্চমাত্রা চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ সাম্প্রতিক ল্যাবরেটরি গবেষণায় গাজীপুর এবং সাভারের মতো শিল্প ঘন এলাকার খাবার পানিতে ভারী ধাতুর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এতে অগভীর নলকূপের (২০ থেকে ৮০ মিটার গভীর) পানিতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সীসা, লোহা এবং ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব এবং ডিজেস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের গবেষকরা ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক গঠন নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা করছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির নিচের স্তরে কেমিক্যাল ডাম্পিংয়ের কারণে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা মানুষের ওরাল বা মুখগহ্বরের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্য দিকে পরিবেশ অধিদফতরের নিজস্ব জলবায়ু ও গবেষণাগার শাখা প্রতি বছর ঢাকার চারপাশের নদীর পানি এবং সংলগ্ন ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করে। তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ছাড়া বর্জ্য ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির মান দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
এ দিকে বিশ্বব্যাংক এবং নেদারল্যান্ডস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের (যেমন ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি) যৌথ গবেষণায় ঢাকার পানির স্তর বা অ্যাকুইফারের ম্যাপিং করা হয়েছে। এতে সায়েন্স ডাইরেক্ট এবং স্প্রিঞ্জার এর মতো বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়েছে, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার ‘ডুপি টিলা’ অ্যাকুইফারে একধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে এবং ওপরের কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি চুইয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। সব ক’টি গবেষণা প্রতিবেদনে এটা পরিষ্কার যে ঢাকার চারপাশের রাসায়নিক বর্জ্য এখন আর কেবল নদীর ওপরে নয়, মাটির গভীরতম সুপেয় পানির স্তরেও বিষ ছড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের অভিযানে এমন দূষণের পেছনে কারখানাগুলোর অনৈতিক কৌশলগুলো উন্মোচিত হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা সরেজমিনে দেখতে পান, সাভার, গাজীপুর, ফতুল্লা এবং বুড়িগঙ্গা তীরের ডাইং, ওয়াশিং ও কেমিক্যাল কারখানাগুলো খরচ বাঁচাতে এবং আইনি ফাঁকফোকর গলে অত্যন্ত চতুর কিছু উপায়ে ইটিপি ব্যবহার না করে সরাসরি বিষাক্ত বর্জ্য প্রকৃতিতে ফেলছে।
পরিবেশ অধিদফতরের সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মূলত অপারেশনাল খরচ কমানো এবং তদারকির অভাবকে পুঁজি করে কারখানাগুলো পরিবেশ দূষণ করছে। তারা বৈধ নিষ্কাশন লাইনের পাশাপাশি মাটির নিচে বা ওয়াশিং ট্যাংকের পেছনে গোপন ’বাইপাস’ লাইন বা পাইপলাইন বসিয়ে নেয়। ইটিপি প্ল্যান্ট সচল না করে, ডাইং বা ওয়াশিং বাথের বিষাক্ত ও রঙিন পানি সরাসরি এই গোপন পাইপ দিয়ে কারখানার পেছনের সরকারি ড্রেন, খাল বা সরাসরি নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
অন্য দিকে একই কারণে অনেক কারখানা দিনের বেলা ইটিপি বন্ধ রাখে এবং রাতের অন্ধকারে বা বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে অপরিশোধিত বর্জ্য ছেড়ে দেয়। আবার পরিবেশ অধিদফতর বা বায়ারদের পরিদর্শনের খবর পেলে দ্রুত ইটিপি চালু করা হয়। পরিদর্শন শেষ হওয়া মাত্রই আবার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেকে আবার কারখানার ছাদ বা চত্বরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য যে উন্মুক্ত ড্রেন থাকে, তার সাথে গোপনে কেমিক্যাল বর্জ্যরে লাইন জুড়ে দেন। এর ফলে কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি কোনো রকম বাধা ছাড়াই উন্মুক্ত মাটিতে ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এর বাইরেও ইটিপি ফাঁকির ভয়াবহ প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, একাধিক অভিযানে তারা এমনও পেয়েছেন, একটি কারখানায় প্রতিদিন হয়তো পাঁচ লাখ লিটার বর্জ্য তৈরি হয়, কিন্তু লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার জন্য তারা মাত্র এক লাখ লিটার ক্ষমতার একটি ছোট ইটিপি স্থাপন করে রাখে। বাকি চার লাখ লিটার অতিরিক্ত বর্জ্য শোধন করার জায়গা বা ক্ষমতা না থাকায় তা সরাসরি কারখানার পেছনে উন্মুক্ত মাটিতে বা গর্তে ডাম্প করা হয়, যা পরে চুইয়ে ভূগর্ভের পানিতে প্রতিদিন মিশে পরিবেশ ধ্বংস করছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো: মাহমুদুর রহমান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, ল্যান্ডফিলের বর্জ্যরে ওপর বৃষ্টির পানি পড়লে তা সঙ্কুুচিত হয়ে অত্যন্ত বিষাক্ত ও গাঢ় তরল বা ‘লিচেট’ তৈরি করে। এই লিচেট মাটির নিচের বালু ও মাটির স্তর ভেদ করে ‘ডুপি টিলা’ নামক ঢাকার প্রধান ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে মিশে যাচ্ছে। এতে করে ঢাকা ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক বিপর্যয় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
তার ভাষ্য, বিরাজমান ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে ঢাকাকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় ‘জিরো লিকুইড ডিসচার্জ’ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক প্রয়োজন। যাতে এক ফোঁটা কেমিক্যাল পানিও কারখানার বাইরে না যেতে পারে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদফতরের ডিজিটাল ল্যাবের মাধ্যমে কারখানার ইটিপিগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ ও পানি শোধনের মাত্রা ২৪ ঘণ্টা অনলাইনে নজরদারি প্রয়োজন। আর ল্যান্ডফিলগুলোকে দ্রুত আধুনিক ‘স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে’ রূপান্তর করা, যাতে লিচেট মাটির নিচে চুইয়ে না পড়ে।