আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাজ্ঞ পাঠকরা জানেন, মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। আর মানসম্মত শিক্ষক তৈরির জন্য দরকার একটি সুসংগঠিত, গবেষণাভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক শিক্ষক শিক্ষা (Teacher Education) ব্যবস্থা। কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান প্রধানত নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়া কতটা উন্নত এবং যুগোপযোগী তার ওপর।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বহু বছর ধরে নানামুখী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও সীমাহীন অবহেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এ উদ্বেগ নিরসনে দেশে একটি পৃথক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Education) প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। কারণ শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষক তৈরি করে না; এটি শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়ী গুণগত উন্নয়ন, শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পাঠ্যসূচি তৈরি এবং শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
একটি বিশেষায়িত শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কেবল নতুন আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা নয়; বরং শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন মানে শিক্ষক শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিক্ষামূলক গবেষণা পরিচালনা, শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারণ এবং নতুন নতুন পাঠদান পদ্ধতি ও কলাকৌশল উদ্ভাবনের জন্য একটি জাতীয় উৎকর্ষকেন্দ্র (Centre of Excellence) গড়ে তোলা বোঝায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে একটি পৃথক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলে এখান থেকে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালিত হবে, আধুনিক শিক্ষক তৈরির কর্মসূচি চালু হবে, শিক্ষামূলক নেতৃত্ব বিকাশ পাবে এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে। এসব ছাড়া জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, উন্নয়ন ও যুগোপযোগীকরণের দায়িত্বও শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় পালন করতে পারবে। এর জন্য সরকারকে আর নিয়ম করে আলাদাভাবে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠনের প্রয়োজন পড়বে না।
বাংলাদেশ বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার, ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুকরণ, শিখনসংকট নিরসন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক তৈরিকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা, এসব ক্ষেত্রে নতুন ধরনের দক্ষতার পাশাপাশি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় দেশে একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে এর মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও শিক্ষা গবেষণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের মানদ- নির্ধারণ করার দায়িত্বও এই শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় পালন করতে পারবে।
আমাদের দেশে বর্তমানে ৫৭টি পাবলিক, ১১৫টি প্রাইভেট এবং ২টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে (ব্যানবেইস, ২০২৫)। পরিতাপের বিষয়, সরকারি ও বেবসরকারি মিলিয়ে ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও আমাদের একটিও শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় নেই! অথচ অন্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কোনো অংশেই কম নয়। উন্নত দেশগুলো শিক্ষক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে সেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন কোনো গুরুতর সংকট বা সমস্যা সচরাচর দেখা যায় না। বিশ্বের বহু দেশেই তাদের সাধারণ শিক্ষা ও শিক্ষক শিক্ষার (General Education and Teacher Education) মানোন্নয়নের জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোনো কোনো দেশে একাধিক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মালয়েশিয়ার সুলতান ইদরিস শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় (Sultan Idris Education University) শত বছরের প্রাচীন একটি বিশেষায়িত শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়, যার পরিচিতি বিশ্বজুড়েই রয়েছে।
তবে এই নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে শুধু জাপানের একটি উদাহরণ উল্লেখ করা হলো।
জাপানে অনেকগুলো শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। সেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় বা University of Education হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া জাপানে শুধু শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানকারী একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে Hyogo University of Teacher Education এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি জাপানে প্রথম শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি চালু করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি পাতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, Hyogo University of Teacher Education is a front-runner in the field of both practice of and research into teacher education in Japan। এ থেকেই শিক্ষকশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষায় গবেষণা নিয়ে জাপান কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু আগে থেকেই বিশে^র অনেক উন্নত দেশ টিচার এডুকেশন নিয়ে গবেষণার ভিত্তিতে শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি (PhD in Education) প্রদান করছে।
অন্যদিকে আমাদের শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ পুরো শিক্ষাব্যবস্থা এতটাই উপেক্ষিত যে প্রায় সব স্তরের শিক্ষায় নানা ধরনের সংকট লক্ষ্য করা যায়। এসব সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক একক কর্তৃপক্ষ ব্যতীত বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণব্যবস্থা তেমন কোনো কাজে দেয় না। আমাদের দেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IER) থাকলেও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় শক্তিশালী কাঠামো গড়ে উঠছে না। এই বাস্তবতায় শিক্ষক শিক্ষা, শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পাঠ্যসূচি যুগোপযোগীকরণ এবং শিক্ষায় গবেষণা, শিক্ষাগত নেতৃত্ব, শিক্ষার্থী মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত, দেশে একটি বিশেষায়িত শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের বড় ধরনের নতুন অবকাঠামোগত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং স্বল্পমেয়াদি সংস্কার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে বিদ্যমান যেকোনো একটি পুরোনো সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজকে সহজেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সম্ভব। আমাদের সামনে উদাহরণ রয়েছে, ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০১০ সালে বস্ত্র প্রকৌশল ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়কে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়েছে।
আলোচ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে শিক্ষক তৈরির কার্যক্রমকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুণগত মান নির্ধারণ, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনায় একটি কেন্দ্রীয় মানদ- প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান পর্যালোচনা, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ ও অধ্যাপক (শিক্ষা), সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা), ময়মনসিংহ।
[email protected]