একধরনের বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা খাত। একদিকে বাড়ছে শিক্ষা বাজেট। নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল একাডেমিক ভবন ও ডিজিটাল অবকাঠামো। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, দক্ষতা ও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষায় সংখ্যাগত উন্নয়ন হলেও মানগত অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সঙ্গে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায়ও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ধাপে ধাপে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা। তবে প্রশ্ন রয়েছে-বাজেট ও অবকাঠামো বাড়লেও শিক্ষার্থীদের শেখার মান সত্যিই বাড়ছে কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সংকট এখন আর শুধু অবকাঠামোর অভাব নয়; বরং বড় সংকট হলো ‘লার্নিং ক্রাইসিস’ (শেখার ঘাটতি)। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণির মাত্র ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে। অনেক শিক্ষার্থীই সাবলীলভাবে পাঠ্যবই পড়তে পারে না। ২০১৯ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালে নেমে এসেছে প্রায় ৭৫ শতাংশে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উন্নয়নে মনোযোগ না দিয়ে প্রশাসনিক বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পদে যাওয়ার জন্য তদবিরে বেশি সময় ব্যয় করছেন। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন, বদলি বা প্রেষণে প্রভাব খাটানোর প্রবণতা বাড়ায় মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতি ঘটছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব-এসব কারণ শিক্ষার্থীদের বিমুখ করে তুলছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা।

একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিক্ষকতা এখন অনেকের কাছে আর পেশাগত দায়বদ্ধতার জায়গায় নেই। অনেকে এটিকে ব্যবহার করছেন প্রশাসনিক সুবিধা বা পদোন্নতির সিঁড়ি হিসাবে। এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শিক্ষকদের তদবিরনির্ভর সংস্কৃতি বন্ধ করে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

এডুকেশন ওয়াচ ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী গাইড বইয়ের ওপর এবং প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে শিক্ষা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে চাপে পড়তে হচ্ছে।

এদিকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে তা কমছে। ২০১৭ সালে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অর্থের সংকট নয়; বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণেও সংকট। কারণ, বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে। অথচ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিখন দক্ষতা উন্নয়ন এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা ও সম্মান এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে দেশের মেধাবী তরুণরা এই পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসাবে বেছে নেন। তিনি বলেন, শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শুধু বেতন বাড়ালেই শিক্ষার মান উন্নত হবে না। শিক্ষকদের জবাবদিহি, কার্যকর নেতৃত্ব এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদানের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো প্রধান শিক্ষক নেই, ব্যবস্থাপনা কমিটি অকার্যকর এবং তদারকির অভাবে শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্কুল মিল, ইউনিফর্ম বা জুতা বিতরণ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে; কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শ্রেণিকক্ষে শেখার পরিবেশে।

সিপিডির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ডিজিটাল শিক্ষা নিয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এখনো সীমিত। প্রাথমিক স্তরে মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরে ১১ শতাংশ ক্ষেত্রে আইসিটি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ বা ডিজিটাল সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো ব্যবহার না হয়ে আলমারিতে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে।

অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬৬ শতাংশ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ২৫ শতাংশ শিক্ষকের কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালুর কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষক এখনো প্রস্তুত নন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। যদিও একই সময়ে প্রায় ৫০ লাখ নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তবে সেই কাজের জন্য দেশের তরুণরা কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, এখন শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলেই হবে না; বরং শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে কী শিখে বের হচ্ছে, সেটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ সময় এসেছে ‘এডুকেশন আউটকাম’ বা শিক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলার।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ১৮০ দিনের বেশকিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ পাবেন ৪ লাখ ৪২ হাজার শিক্ষক। প্রায় ৯০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করার কাজ চলছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ শতাংশ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠদান সুবিধা দেওয়া হবে। এরকম ৩৬টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews