মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও সুস্থভাবে কাটানো জীবনের সময় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকার সময় বা ‘মরবিডিটি গ্যাপ’। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই) পরিচালিত গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি) ২০২৩ স্টাডিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৬৪ দশমিক ৬ বছর, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৭৩ দশমিক ৮ বছরে পৌঁছেছে। একই সময়ে সুস্থ জীবনযাপনের গড় আয়ু ৫৫ দশমিক ৯ বছর থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৩ দশমিক ১ বছর। অর্থাৎ মানুষের আয়ু বাড়লেও সুস্থভাবে কাটানো সময় তুলনামূলক কম বেড়েছে।
এর ফলে অসুস্থতা বা অক্ষমতা নিয়ে কাটানো সময়, অর্থাৎ মরবিডিটি গ্যাপ, ১৯৯০ সালের ৮ দশমিক ৮ বছর থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১০ দশমিক ৭ বছরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে একজন মানুষ তার জীবনের গড়ে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ সময় অসুস্থ অবস্থায় কাটাচ্ছেন, যেখানে ১৯৯০ সালে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে একজন মানুষ গড়ে ১৪ বছর, অস্ট্রেলিয়ায় ১৩ দশমিক ৯ বছর এবং কানাডায় ১৩ দশমিক ৭ বছর অসুস্থতা নিয়ে জীবন কাটান। অন্যদিকে সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই ব্যবধান তুলনামূলক কম, গড়ে ৯ বছর।
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রায় সব অঞ্চলেই নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচলেও অসুস্থ অবস্থায় কাটানো সময়ও তাদের বেশি। গবেষণা অনুযায়ী, নারীদের গড়ে ১২ দশমিক ১ বছর এবং পুরুষদের ৯ দশমিক ৩ বছর অসুস্থতা নিয়ে কাটে।
বিশ্বব্যাপী অসুস্থ অবস্থায় কাটানো সময়ের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে মাস্কুলোস্কেলেটাল রোগ, বিশেষ করে কোমরব্যথা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং দুর্ঘটনাজনিত আঘাত। পাশাপাশি উচ্চ রক্তে গ্লুকোজ, অতিরিক্ত ওজন, শিশু ও মাতৃ অপুষ্টি এবং তামাক ব্যবহারকে প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইএইচএমইর পরিচালক ড. ক্রিস্টোফার মারে বলেন, ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শুধু মানুষের আয়ু বাড়ানো নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় বৃদ্ধি করা। এজন্য রোগ প্রতিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী রোগের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
গবেষণার সিনিয়র সায়েন্টিফিক রাইটার ক্যাথরিন বিসিগনানো বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচেন, তবে সেই অতিরিক্ত সময়ের বড় অংশই তারা অসুস্থ অবস্থায় কাটান।
যদিও গবেষণায় বাংলাদেশের পৃথক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিশু ও মাতৃ অপুষ্টি, বায়ুদূষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে জনসংখ্যার গড় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে উঠছে।