১৯৩০ সালের উরুগুয়ে বিশ্বকাপ যেন ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক রোমান্টিক সূচনা। কিন্তু চার বছর পর ইতালি বিশ্বকাপ এসে বদলে দিল পুরো দৃশ্যপট। ফুটবল আর শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না, জড়িয়ে গেল রাষ্ট্রশক্তি, রাজনীতি, ক্ষমতার দম্ভ আর অহংকার। যেখানে বলের সঙ্গে ঘুরেছে রাজনীতির চাকা, আর স্টেডিয়ামের গর্জনের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক যুগের অস্থির ইতিহাস।
বিশ্বকাপ এবার ইউরোপে। দূরত্ব, উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সবই বেশি হয়েছে বহুগুণ। সবাইকে বিস্মিত করে প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে টুর্নামেন্টেই এল না। ইউরোপে এসে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর আশঙ্কা, সঙ্গে আগের বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহা, সব মিলিয়ে উরুগুয়ে যেন অভিমান নিয়েই বিশ্বকাপ বয়কট করল।
অন্যদিকে ইতালি তখন প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি বুঝেছিলেন, বিশ্বকাপ তার জাতীয় শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চও বটে। ফলে গোটা ইতালি ঝাঁপিয়ে পড়ল আয়োজন সফল করতে। মুসোলিনির ঘোষণা ছিল, অতিথিদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, এই বিশ্বকাপ হতে হবে ইতিহাসের সেরা আয়োজন।
ইতালির জাতীয় দল ‘আজ্জুরি’ তখন পরিচিত ছিল ‘মুসোলিনির আজ্জুরি’ নামে। স্বয়ং মুসোলিনি ইয়টিং ক্যাপ পরে স্টেডিয়ামে হাজির হতেন। আর মাঠের বাইরে যেমন ফ্যাসিবাদের কঠোর ছায়া, মাঠের ভেতরে তেমনি শৃঙ্খলার প্রতীক ছিলেন ইতালির কোচ ভিট্টোরিও পোজো।
কোচ পোজো রীতিমতো মনস্তত্ত্বের জাদুকর ছিলেন। তিনি বুঝতেন, বড় দল হয়ে উঠতে স্রেফ প্রতিভাই যথেষ্ট নয়, মানসিক ঐক্যও জরুরি। মিলান আর জুভেন্টাসের খেলোয়াড়দের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল। পোজো সেই বৈরিতা ভাঙতে তাদের একই কক্ষে রাখলেন। খেলোয়াড়রা আপত্তি তুললে তিনি শান্ত গলায় বলেছিলেন, ‘আমি চাই তোমাদের মধ্যে টিম স্পিরিট তৈরি হোক। তোমরা একে অপরের শত্রু নও।’
পরদিন মজার ছলে খেলনা ভালুক হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কি হে নরমাংসভোজীরা, তোমরা কি একে অপরকে খেয়ে ফেলেছ?’
সেই মুহূর্তেই বরফ গলতে শুরু করে। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করা পোজো গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলা দেখে। চার্লি রবার্টস, স্টিভ ব্লুমারদের শক্তিশালী ফুটবল তার দর্শনের ভিত গড়ে দেয়। পরে সেই দর্শনেই তিনি তৈরি করেন ইতিহাসের অন্যতম সংগঠিত ইতালি দল।
তবে ইতালি বিশ্বকাপ ছিল বিতর্কেও ভরা। বহু দেশের অভিযোগ ছিল, টুর্নামেন্টে রেফারিং নিয়ে ইতালি প্রভাব খাটিয়েছে। স্পেন-ইতালির কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল যেন যুদ্ধক্ষেত্র। কিংবদন্তি গোলকিপার রিকার্ডো জামোরা ক্যারিয়ারের সেরা নৈপুণ্য দেখালেও ইতালির দুর্দান্ত আক্রমণে স্পেন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। সুইস রেফারি মারসেটের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা এতটাই তীব্র ছিল যে, তার দেশের ফেডারেশনই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ ছিল সে সময় ইউরোপের সবচেয়ে শৈল্পিক দলগুলোর একটি। কোচ হুগো মেইসল ও তারকা মাথিয়াস সিন্ডেলার ফুটবলকে দিয়েছিলেন এক নতুন সৌন্দর্য। ছোট ছোট পাস, নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ আর শিল্পময় মুভমেন্টে তারা মুগ্ধ করেছিল পুরো ইউরোপকে।
কিন্তু সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে সেই শিল্প থেমে যায় কাদা আর ভারী মাঠে। লুইস মন্টির কঠোর পাহারায় বন্দি হয়ে পড়েন সিন্ডেলার। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত এনরিকে গাইতার গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে ইতালি।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ চেকোশ্লোভাকিয়া। রোমের স্টেডিও ন্যাশনালে গ্যালারি ভর্তি ইতালীয় সমর্থক, চারদিকে উন্মত্ত চিৎকার। অথচ ম্যাচের ৭৬ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য। তারপর পাকের শটে এগিয়ে যায় চেকোশ্লোভাকিয়া। ইতালির স্বপ্ন যেন ধূসর হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ফুটবল তখনও নাটকের শেষ দৃশ্য দেখায়নি।
খেলা শেষের মাত্র আট মিনিট আগে লেফট উইঙ্গার রাইমুন্ডো ওরসির দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া শট, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়। বল প্লানিকার আঙুল ছুঁয়ে জালে ঢুকে পড়ে। পুরো স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয় উল্লাসে।
অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত, খোঁড়াতে থাকা জিউসেপ্পে মিয়াজ্জা ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত পাস বাড়ালেন। শিয়াভিও সামান্য ফাঁক পেয়ে শট নিতেই হার মানেন প্লানিকা। ইতালি ২-১। বিশ্বকাপ তাদের।
শেষ বাঁশি বাজার পর ইতালিজুড়ে উল্লাস নেমে এল। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র সেটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবেই প্রচার করল। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। অনেকেই বলেছিলেন, অন্য দেশে এই টুর্নামেন্ট হলে ইতালি হয়তো চ্যাম্পিয়ন হতে পারত না।
তবে চার বছর পর ফ্রান্সের মাটিতেও বিশ্বকাপ জিতে ইতালি প্রমাণ করেছিল, তারা শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই পরাশক্তি নয়, ফুটবলীয় দিক থেকেও চ্যাম্পিয়ন দলই বটে।