পাবনার ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংবাদ সম্মেলন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্বাচনি অফিস ও মিছিলে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ১৫টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও ৬টি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে বিএনপি অফিসে সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাজার অভিমুখে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর এ হামলার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন।
হামলায় কমপক্ষে ২১টি মোটরসাইকেলে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বিক্ষুব্ধ কর্মীরা দেরি করার অভিযোগে বাধা প্রদান করে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের সমর্থকরা পৌর শহরের পোস্ট অফিস মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেলগেট অতিক্রম করছিলেন। এসময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থকদের মধ্যে তাদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলি ও ককটেল হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ জন আহত হন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্বাচনের প্রধান কার্যালয়ে ভাঙচুর করেন প্রতিপক্ষরা। এ সময় কার্যালয়ের সামনে থাকা দলীয় নেতাকর্মীদের ১৫টি মোটরসাইকেল ভাংচুর ও ৬টিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
এ সময় পুলিশ কর্মকর্তা প্রণব কুমারসহ কমপক্ষে ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হামলায় হাবিবের অফিসের চেয়ার টেবিল, এসিসহ সব আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়।
পিন্টু সমর্থকদের দাবি, ৪নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আব্দুলকে মিথ্যা কথা বলে ঈদের দিন ভোরে ডেকে নিয়ে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। তিনি এখন রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনায় পিন্টু সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
এদিকে হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্বাচনি কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ এবং অপর সংবাদ সম্মেলনটি ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবে আয়োজন করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান।
সোমবার (২৩ মার্চ) বেলা ১১টায় ঈশ্বরদী পোস্ট অফিস মোড় এলাকায় বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ। তিনি অভিযোগ করেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় বিএনপির বহিষ্কৃত জাকারিয়া পিন্টু, তার আপন ভাই বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মেহেদী হাসান, জুয়েল, সোনামনি ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী ঈদের দিন রাতে ঈশ্বরদী শহরের ফতেহমোহাম্মদপুর এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা ও গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।
এ সময় বিএনপি নেতা জিয়াউল ইসলাম সন্টু সরদার, দাশুড়িয়ার সাবেক চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম তুহিন, নয়ন, সাবেক ছাত্রনেতা রেজাউল করিম ভিপি শাহিনসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মাহবুবুর রহমান পলাশ বলেন, এনামের বাড়িতে জাকারিয়া পিন্টু গুলিবর্ষণ করেন। এতে এনামের ছেলের পায়ে গুলি লাগে। সে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। এরপর তারা গোরস্থানপাড়ায় আলাউদ্দিনের বাড়িতে একই কায়দায় হামলা ও গুলিবর্ষণ করে। এই সন্ত্রাসী বাহিনী সাবেক ছাত্রদল নেতা মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল, ফরিদ, চুপ্পু প্রমুখের বাড়িতে হামলা ও গুলিবর্ষণ করে।
তিনি আরও বলেন, রোকসানা (২৬) নামে একজন বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে ঈদের দিন রাতে তার আত্মীয়স্বজনকে মারধর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে থানায় ওসি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে মোবাইলে অনুরোধ করি। প্রায় ৪২ ঘণ্টা পর পুলিশ রেললাইনের পাশ থেকে রোকসানাকে উদ্ধার করে। আমি প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই বাকপ্রতিবন্ধী এই অসহায় মেয়েটির মেডিকেল টেস্ট করে অপহরণকারীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
মাহবুবুর রহমান পলাশ আরও বলেন, জাকারিয়া পিন্টু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন- আমি জোর করে দল করেছি ভবিষ্যতেও জোর করে দল করব। তার সেই ঘোষণা বাস্তবায়নে এখন সন্ত্রাস করছে। যারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছে বেছে বেছে তাদের বাড়িঘরে হামলা করা হচ্ছে।
পলাশ বলেন, পিন্টুর ভাই মেহেদী নির্বাচনের আগে ঢাকা হাইকোর্টে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অপরাধে যুবদল থেকে বহিষ্কৃত হয়। এভাবে তারা ঈশ্বরদীতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে দীর্ঘদিন দলের বদনাম করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাড়িতে হামলার বর্ণনা দিয়ে কথা বলেন সাবেক ছাত্রদল নেতা মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল, ইমরুল কায়েস সুমন। সংবাদ সম্মেলন শেষে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
এদিকে একই সময় জাকারিয়া পিন্টুর ভাই সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মেহেদী হাসান ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীর চিহ্নিত প্রতারক ইমরুল কায়েস সুমন ওরফে টেপা সুমন ২০১৯ সালে ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। সম্প্রতি তিনি ঈশ্বরদীতে ফিরে আবারও নানান ঘটনা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, গত ২১ মার্চ তার অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে বলে ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সুমন থানায় একটি মিথ্যা অভিযোগ করেন আমার নামে। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই পুলিশ এটি এন্ট্রি করে ১নং ওয়ার্ডের বিএনপি কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হয়রানি করছে। তার অফিসে হামলার ঘটনাটি সুমনের সাজানো বলে তিনি দাবি করেন।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার জানান, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহরের অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।