নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া কাউন্টির স্টেট রুট 9H সোমবার সন্ধ্যায় অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। বসন্তের শেষ বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। কিন্তু সন্ধ্যা প্রায় ৭টার দিকে ক্লেভারাক এলাকায় আচমকাই বদলে যায় সবকিছু। দুটি টয়োটা গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিভে যায় চারটি প্রাণ। সেই আঘাতে ব্রঙ্কসের এক বাংলাদেশি পরিবারের জীবনেও নেমে আসে গভীর শোক।
লাউডনভিলের (Loudonville) বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী নাজমুল রোবেল তার ২০০৯ মডেলের টয়োটা প্রিয়াস (Toyota Prius) নিয়ে উত্তরমুখী পথে ছিলেন। গাড়িটিতে তার সঙ্গে ছিলেন ব্রঙ্কসের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ হেরামন, ২৫ বছর বয়সী ফাহিম হালিম, ৩৩ বছর বয়সী ফাতিমা আক্তার এবং ১ বছরের এক কন্যাশিশু।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাত কারণে নাজমুল রোবেলের প্রিয়াসটি হঠাৎ সেন্টার লাইন অতিক্রম করে বিপরীত লেনে চলে যায়। ঠিক সেই সময় দক্ষিণমুখী লেনে আসছিল একটি ২০২৫ মডেলের টয়োটা ক্রাউন। সেটি চালাচ্ছিলেন ব্রুকলিনের ২৪ বছর বয়সী লুকা প্যালভেনিয়ান। পাশে ছিলেন ৬২ বছর বয়সী জুলিয়া রিচি।
মুখোমুখি সেই সংঘর্ষের তীব্রতা ছিল অকল্পনীয়। প্রিয়াস গাড়িটির সামনের অংশ প্রায় দুমড়েমুচড়ে ধাতব পিণ্ডে পরিণত হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা যে দৃশ্য দেখেন, তা ছিল শিউরে ওঠার মতো। শেরিফ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নাজমুল রোবেল, মোহাম্মদ হেরামন, ফাহিম হালিম এবং অপর গাড়ির যাত্রী জুলিয়া রিচি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত জটিল। ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবাকর্মীদের বিশেষ হাইড্রোলিক যন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি থেকে হতাহতদের বের করতে হয়। তদন্ত ও উদ্ধারকাজের জন্য স্টেট রুট 9H প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার মধ্যেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ফাতিমা আক্তার এবং ১ বছরের কন্যাশিশুটি। ফাতিমাকে অ্যাম্বুলেন্সে এবং শিশুটিকে লাইফনেটের মাধ্যমে আলবানি মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফাতিমা আক্তারের অবস্থা গুরুতর কিন্তু স্থিতিশীল, আর শিশুটি সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
অপর গাড়ির চালক লুকা প্যালভেনিয়ানও এ দুর্ঘটনায় আহত হন। তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট, সংঘর্ষটি শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং মুহূর্তের মধ্যে একাধিক পরিবারকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কলাম্বিয়া কাউন্টি শেরিফের দপ্তর জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন। শেরিফ জ্যাকি সালভাতোরের নেতৃত্বে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, কী কারণে প্রিয়াস গাড়িটি হঠাৎ বিপরীত লেনে চলে গিয়েছিল। কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নাকি অন্য কোনো কারণ এতে ভূমিকা রেখেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মোহাম্মদ হেরামন ও ফাহিম হালিমের মৃত্যুতে ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোক নেমে এসেছে। একই পরিবারের দুই সদস্যকে একসঙ্গে হারানোর বেদনা প্রবাসী সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্বজন, পরিচিতজন এবং কমিউনিটির মানুষ এখন আহত মা ও শিশুটির সুস্থতার খবরের অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন।
এই মহাসড়ক হয়তো আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাবে, কিন্তু ব্রঙ্কসের সেই পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এখন সবার প্রার্থনা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফাতিমা আক্তার ও ১ বছরের শিশুটি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে।
তথ্যসূত্র:
Times Union (৮ এপ্রিল ২০২৬)
CBS6 Albany (৮ এপ্রিল ২০২৬)
WNYT (৮ এপ্রিল ২০২৬)
(ভিডিও সংযুক্ত)