পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নাটকীয় পটপরিবর্তনের পর রাজ্যের মসনদে বসেই সীমান্ত নীতি এবং তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুতে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং জমি অধিগ্রহণের কাজে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাতে শুরু করেছে কলকাতা।

একই সঙ্গে খুনি হাসিনা সরকারের ওলটপালটের পর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টিকে ‘চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ’ অক্ষের এক নতুন জুজু হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে ভারতীয় গণমাধ্যম ও নীতি-নির্ধারকদের একাংশের তরফ থেকে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন— এই উদ্বেগ কি সত্যিই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, নাকি পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র ‘বাংলাদেশ ভীতি’ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ উস্কে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এক সুগভীর কূটকৌশল?

ভারতের দ্য প্রিন্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শুভেন্দু অধিকারী সরকার বিগত তৃণমূল সরকারের আটকে রাখা প্রায় ৭টি জাতীয় সড়কের বিস্তৃতি এবং সীমান্ত সড়ক প্রকল্পের ফাইল এক ঝটকায় অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বসিরহাট, বনগাঁ, ঘোজাডাঙ্গা এবং চ্যাংড়াবান্ধা রুটের সড়কগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, শিলিগুড়ি করিডোরে মাটির নিচ দিয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রেল লিংক’ ও বুলেট ট্রেনের তোড়জোড় চলছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা থেকে শুরু করে দিল্লির থিংক-ট্যাংকগুলো একে ‘কৌশলগত ব্রেকথ্রু’ হিসেবে প্রচার করছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ সীমান্তে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই নিশ্ছিদ্র যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পগুলো হঠাৎ করে যুদ্ধের প্রস্তুতি সাজার মতো করে বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার মূল লক্ষ্য সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে এক কাল্পনিক শত্রুভীতি তৈরি করা।

শুভেন্দু সরকারের এই অতি-তৎপরতার পেছনে সবচেয়ে বড় অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত এই বিমানঘাঁটিটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীন ও পাকিস্তানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নতুন করে সচল করছে। যেহেতু এটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১২ থেকে ২০ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ১৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, তাই একে ভারতের জন্য ‘মারাত্মক সামরিক হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র তার নিজস্ব সীমানার ভেতরে যেকোনো অবকাঠামো উন্নয়ন বা সামরিক ঘাঁটির আধুনিকায়ন করার পূর্ণ অধিকার রাখে। বাংলাদেশ তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা সুরক্ষায় এই পদক্ষেপ নিতেই পারে। কিন্তু ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা একে ‘পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ’ অক্ষের এক কাল্পনিক ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করে সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা, নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের যৌক্তিকতা খুঁজছে। এর মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নিছক জাতীয় নিরাপত্তা, নাকি রাজনৈতিক ফায়দার কূটকৌশল?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় একটি অংশের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘সীমান্ত নীতি’ মূলত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চেনা মেরুকরণের কৌশলেরই অংশ। নির্বাচনের পর রাজ্যের অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান বা জনগণের দেওয়া সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির চেয়ে ‘বহিরাগত শত্রু’ বা ‘সীমান্তের হুমকি’কে বড় করে দেখালে জনগণের মৌলিক দাবিদাওয়াকে ধামাচাপা দেওয়া সহজ হয়।

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দিল্লির সেবাদাসী শেখ হাসিনা সরকারের একচেটিয়া দিল্লি-তোষণ নীতির অবসান ঘটেছে। বাংলাদেশে এখন জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটছে। এই নতুন ঢাকাকে দিল্লির একাংশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিজেপি সরকার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ হিসেবে দেখতে নারাজ। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ’ বা ‘সীমান্তে উগ্রবাদের উত্থান’—এর মতো জুজু তৈরি করে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়াই এই অতি-উদ্বেগের আসল কারণ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যেখানে ল্যান্ড লুজার (ভূমিহারা) বা সীমান্ত এলাকার মানুষের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণে কিছুটা সংবেদনশীল ছিল, সেখানে শুভেন্দু সরকার এসেই দিল্লির ‘আগ্রাসী সীমান্ত নীতি’র লাইনে হাঁটছে। এতে করে সীমান্ত এলাকার স্থানীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতের একটি শান্ত ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী হিসেবে ভূমিকা পালন করে এসেছে। বিগত দিনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি করিডোরের তথাকথিত ‘দুর্বলতা’ এবং লালমনিরহাটের সাধারণ বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণকে যেভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা মূলত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই অতি-উদ্বেগ আসলে রাজনৈতিক স্বার্থে ‘বাংলাদেশ ভীতি’ ছড়ানোর এক পরিকল্পিত চাল, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং সীমান্তে এক কৃত্রিম উত্তেজনা জিইয়ে রাখবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews