এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে সবচেয়ে আলোচিত দল হিসেবে আর্জেটিনাকে ঘিরে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা যেন থামছেই না। শুধু মাঠে বা আড্ডায় নয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এবার ব্যাপক বিতর্ক চলছে।
টেলিগ্রাফ অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টগুলো যদি সত্যিই জনমতের প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার আগে আর্জেন্টিনা যেন এমন একটি দল, যাকে ‘পুরো বিশ্ব ঘৃণা করছে’- এমন ধারণাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।

‘পুরো বিশ্ব ঘৃণা করছে’ এই বাক্যটি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিমগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হেট (ঘৃণা)’ শব্দকে কেন্দ্র করে অসংখ্য পোস্ট, মিম ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে।

ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ‘হেট-ওয়াচিং আর্জেন্টিনা’ শব্দগুচ্ছও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর অর্থ, কেউ আর্জেন্টিনার খেলা উপভোগ করার জন্য নয়, বরং দলটিকে বিদ্রূপ করা, সমালোচনা করা বা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারতে দেখার আশায় ম্যাচ দেখছেন।

এদিকে কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আবার দাবি করেছেন, একটি পোস্টে শুধু ‘আর্জেন্টিনা’ এবং ‘হেট’- এই দুটি শব্দ ব্যবহার করলেই শত শত, এমনকি হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে।
তেমনি ব্যাপকভাবে শেয়ার হওয়া একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, পুরো বিশ্ব আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করে। আরেকটি ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ব্রেকিং: বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত দেশ আর্জেন্টিনা।
একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, মেসি বা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যেকোনো ঘৃণামূলক পোস্টই ৫০ হাজারের বেশি লাইক পায়, তা যতই অযৌক্তিক হোক না কেন। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, মেসি ও আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে আর্জেন্টিনা অনলাইনে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ও বিতর্কিত দলে পরিণত হলো
সাধারণভাবে ভালো খেলা ও ধারাবাহিক জয় একটি দলের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে যেন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। দলটির প্রতিটি জয়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সমালোচনা, ট্রল, মিম এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঢেউ তুলছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রশংসিত দল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শিরোপা জয়ের পর বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর সমর্থন পায় দলটি। সেই সাফল্য মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তবে চার বছর পর চিত্রটি অনেকটাই বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনা ও মেসিকে ঘিরে ইতিবাচক আবহের বদলে এখন সমালোচনা, ট্রল এবং বিতর্কই যেন বেশি চোখে পড়ছে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের কারণে খেলাধুলা ও রাজনীতির মধ্যকার সীমারেখা অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
গাজা, ইউক্রেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাবও ফুটবল আলোচনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ফিফা বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, বরং নানা রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্কেরও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে লিওনেল মেসিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও ট্রলের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।

একটি ভাইরাল মন্তব্যে লেখা হয়েছে, পুরো বিশ্ব জানে, মেসি ফিফার আদরের ছেলে। আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, নতুন অপছন্দের বিষয়- আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনা এবং মেসিকে নিয়ে ট্রলিং এখন অনেকটাই নাটকীয় রূপ নিয়েছে। একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, স্টেডিয়ামে যদি আর্জেন্টিনা একাই খেলত, তবুও আমি আর্জেন্টিনার বদলে স্টেডিয়ামের পক্ষেই সমর্থন করতাম।
তবে আরেকজন লিখেছেন, আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করার বিষয়টা এখন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবাই যেন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চাকরির মতো নিয়ম করে শুধু আর্জেন্টিনার পতন কামনা করছে। তোমরা নিজেদের দলের চেয়ে আর্জেন্টিনাকেই বেশি ঘৃণা করো। মেসি যেন কারও কারও মাথায় এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, তিনি যেন সেখানে ভাড়া দিয়ে বসবাস করছেন।

ফুটবলের বাইরেও দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনার একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। দেশটির ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঘিরে জটিল ঐতিহাসিক বিষয়গুলো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সময় প্রায়ই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। লিওনেল মেসির জেরুজালেম সফর এবং ইসরাইলি নেতাদের সঙ্গে তার সাক্ষাতের পুরোনো খবর আবারও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা অবস্থায় দেখানো একটি ছবি ভাইরাল হলে নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। যদিও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

এবার আর্জেন্টিনাকে ঘিরে ক্ষোভ শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর প্রভাব বাস্তব জীবনেও দেখা গেছে।
বিশ্বকাপ থেকে মিশরের বিদায়ের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে হাত দিয়ে ইংরেজি ‘এক্স’ আকৃতির ইশারা করেন, যা ফিফার বর্ণবাদবিরোধী সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত।
এবারের আসরে ওই ম্যাচটি ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত হয়েছে। এদিকে, মেসির কিছু অঙ্গভঙ্গি বর্ণবাদী ইঙ্গিত ছিল কিনা, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো এখনও বিভিন্ন মহলে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিষয় হয়ে আছে।
ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, মিশরের কিছু সমর্থক ক্ষোভে মেসির জার্সিতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ মিশরের বিদায়ের পর সেই জার্সিকে দরজার পাপোশ হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।
তবে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সমালোচনা শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক আলোচনাই পরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিতর্কের দিকেও গড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু পোস্টে আলোচনা ফুটবল ছাড়িয়ে ভূরাজনীতিতেও পৌঁছেছে।

একটি ভাইরাল মন্তব্যে আর্জেন্টিনাকে ‘লাতিন আমেরিকার ইসরাইল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য পোস্টে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অগ্রযাত্রাকে চারদিকের বিরূপ মনোভাবের বিরুদ্ধে একটি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বহুল আলোচিত এক পোস্টে লেখা হয়েছে, পুরো বিশ্ব তাদের ঘৃণা করলেও আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। পরে এই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মিম ও পোস্টে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে, ইন্টারনেটের প্রতিক্রিয়াকে যদি মানদণ্ড ধরা হয়, তাহলে একসময় কোটি ভক্তের প্রিয় আর্জেন্টিনা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত দলে পরিণত হয়েছে।
আর দলটির প্রতিটি জয় যেন নতুন করে সমালোচনা, ট্রল এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আগুনে আরও ঘি ঢালছে। 



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews