বাবা কলিম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঠিকাদার। পাকা ব্যবসাদার মানুষ। আরও নানা দিকে ছিল আগ্রহ। ঢালিউডের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর অন্যতম প্রযোজকও তিনি। তাঁর স্বপ্ন, বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক ব্যবসা সামলাবে। কিন্তু ছেলে আলমগীরের ঝোঁক—সিনেমা, গান আর খেলাধুলা।
ষাটের দশকের ঢাকায় তেজগাঁওয়ে ধুলোমাখা মাঠ, ফুটবল আর ক্রিকেটের উত্তেজনার মধ্যে কেটেছে আলমগীরের শৈশব। তার মধ্যেই হলিক্রস স্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল। মাঝখানে পাঞ্জাবের সারগোদা ক্যাডেট স্কুলের কঠিন পরিবেশে কাটে দুই বছর। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় বার্ষিক অনুষ্ঠানে গান ও অভিনয়ে নাম লেখান। অভিনয়ে বাদ পড়লেও গানে সুযোগ পান। তাঁর গলায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘কত রাগিণীর ভুল ভাঙাতে’ শুনে বাংলার শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘তোমার গলাটা মিষ্টি, তুমি গান করো।’
তাই বাবার বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এইট–নাইনে পড়ার সময় পকেট খরচের টাকা জমিয়ে গ্রীন রোডে পাকিস্তান সংগীত একাডেমিতে ভর্তি হন। সেখানেই সৈয়দ আব্দুল হাদীর কাছে শেখেন আধুনিক গান, কমল দাশগুপ্তর কাছে কিছুদিন শাস্ত্রীয় সংগীতও শেখেন। তবে তিন মাসের মধ্যেই সেই একাডেমি বন্ধ হয়ে যায়।
শুধু গানই নয়, ওই সময় থেকে সিনেমার পোকাও মাথায় ঢোকে। ভারত-পাকিস্তানের সিনেমা দেখতেন নিয়মিত। দিলীপ কুমার, উত্তম কুমার, রাজ্জাক ছিলেন তাঁর নীরব অনুপ্রেরণা। বাড়ির বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অনুকরণ করতেন তাঁদের স্টাইল, চুলের ভঙ্গি, চোখের চাহনি—প্রতিদিন নীরবে চলত প্রস্তুতি।
খেলাধুলাতেও ছিলেন এগিয়ে। ফুটবলে গোলরক্ষক আর ক্রিকেটে ব্যাটসম্যান। ট্রিপল জাম্পে ইস্ট পাকিস্তানে আন্তস্কুল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। বাড়ির পাশেই ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজের (বর্তমান বিজ্ঞান কলেজ) মাঠ। এখানে নিয়মিত ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতেন। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে আলমগীর বললেন, ‘ক্রিকেটে আমার সঙ্গী আজকের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও। আমরা উনাকে প্যান্ট–শার্ট পরিয়ে ক্রিকেট খেলাইছি। কারণ, উনি তো জীবনে কখনো পায়জামা–পাঞ্জাবি ছাড়া কিছু পরেননি। তিনি ছিলেন সেই কলেজের প্রফেসর!’
এসএসসি শেষে নটর ডেম কলেজ, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি। একসময় করাচি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে যান, আবার ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ে ভর্তি হন। এই ছাত্রজীবনের মধ্যেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল অন্য এক আলমগীর। তিনি বলেন, ‘উত্তম কুমারের সিনেমা দেখে নিজেকে উত্তম কুমার ভাবতাম। নিজে যখন অভিনয় শুরু তখন পর্দায় দেখে মনে হলো, অধম কুমার হওয়ার যোগ্যতাও বুঝি আমার নেই।’