কোন দেশ ও জাতির জন্য ঋণ নির্ভরতা কোন ভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু আমাদের বৈদেশিক ঋণ ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ৭৮.০৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত বৈদেশিক ঋণ বেড়ে প্রায় ১১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারের নিজস্ব বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৮.০৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯.৬৩৭ ট্রিলিয়ন টাকা। বেসরকারি খাতের ঋণসহ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বা এক্সটার্নাল ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ (IMF)-এর হিসাবমতে, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৪১%। যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখবর নয়।

একদিকে আমাদের দেশের ঋণ যেমন চক্রাকারে বাড়ছে, ঠিক তেমনিভাবে বিদেশী ঋণ পরিশোধে চাপও বেড়েছে। তাই আমরা বিশাল পরিমাণ ঋণের বোঝা নিয়ে কোন ভাবেই সামনে দিকে এগুতে পারছি না। যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রাপ্ত তথ্যে জ্ঞাত হওয়া গেছে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপের প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) বিদেশী ঋণদাতাদের অতীতের ঋণের সুদ, আসলসহ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি শোধ করতে হয়েছে। এর বড় অংশই গেছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের কাছে। সার্বিকভাবে বিদেশী ঋণের অর্থছাড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুদাসল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জুলাই-মে মাসের বিদেশী ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখা গেছে, ওই ১১ মাসে আগের নেওয়া ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণ দাতাসংস্থা ও দেশকে ৪১৩ কোটি ২৩ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা বিদেশী ঋণ শোধে নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া টাকার হিসাবে ওই সময়ে ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি শোধ করতে হয়েছে। জুলাই-মে সময়ে বিদেশী ঋণ ও অনুদান এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার।

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বিদেশী ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের বিদেশী ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। এবার ১১ মাসেই এর চেয়ে বেশি শোধ করল বাংলাদেশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, একই ধারায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হলে এ বছর বিদেশী ঋণ শোধের পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি ডলার পার হতে পারে।

ইআরডির প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিদেশী ঋণের আসল ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ও সুদ ১৪৫ কোটি ডলার শোধ করেছে সরকার। অন্যদিকে ৪১৪ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে এবং ৪৩ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪২২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সাড়ে ৫০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। এরপর আছে রাশিয়া। রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৭৮ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে ৫৩ কোটি ডলার ও ২৫ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ৪৩ কোটি ডলার।

সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এ ছাড়া বাজেট সহায়তা হিসেবেও অর্থ নেয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়। এবার সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে সেটিও ঋণ নির্ভর। তাই ঋণ নির্ভর বাজেট কোন ভাবেই বাস্তবায়নযোগ্য মনে করছেন না অর্থনীতিবিদরা।

এমতাবস্থায় সরকারকে তুচ্ছ কারণে ঋণ গ্রহণের অশুভ বৃত্ত থেকে অবশ্যই বেড়িয়ে আসতে হবে। জোর দিতে হবে ঋণ পরিশোধের ওপর। অন্যথায় বিশাল ঋণের চাপ আগামী দিনে আরো বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল কোন ভাবেই সম্ভব হবে না। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews