বিশ্বজুড়ে ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত জনপ্রিয় ওষুধ ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির সক্রিয় উপাদান সেমাগ্লুটাইড এবার নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে এই উপাদানটি মদ্যপানের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে একই সঙ্গে স্থূলতা ও মদাসক্তি—এই দুটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সম্ভাব্য নতুন পথ খুলছে।
ডেনমার্কের মেন্টাল হেলথ সেন্টার কোপেনহেগেনের গবেষকেরা স্থূলতা ও অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত সমস্যায় ভোগা ১০৮ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করেন। অংশগ্রহণকারীরা সবাই সক্রিয়ভাবে মদ্যপান কমানোর চেষ্টা করছিলেন। তাদের অর্ধেককে ছয় মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে একবার সেমাগ্লুটাইড ইনজেকশন দেওয়া হয়, আর বাকি অর্ধেককে দেওয়া হয় প্লাসেবো (নিষ্ক্রিয় ওষুধ)। একই সঙ্গে সবাই মদ্যপান কমাতে সহায়ক থেরাপি গ্রহণ করেন।
দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার সেমাগ্লুটাইড নেওয়ার পর ‘ভারী মদ্যপান’ প্রায় ৪১ শতাংশ কমে যায়। তুলনামূলকভাবে প্লাসেবো (যেখানে অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃত ওষুধ না দিয়ে কার্যকর উপাদানবিহীন একটি নকল ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে তুলনা করা যায়) নেওয়া দলের ক্ষেত্রে এই হ্রাস ছিল ২৬ শতাংশ। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা নিশ্চিত করেন।
সেমাগ্লুটাইড GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট শ্রেণির একটি ওষুধ, যা খাওয়ার পর অন্ত্রে তৈরি হওয়া হরমোনের মতো কাজ করে। এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং মস্তিষ্কে তৃপ্তির সংকেত পাঠিয়ে ক্ষুধা কমায়—ফলে ওজন হ্রাস পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই সঙ্গে এটি মদ্যপানের আকাঙ্ক্ষাও কমিয়েছে। ওষুধ গ্রহণকারীরা অ্যালকোহলের প্রতি টান কম অনুভব করেছেন, পাশাপাশি ওজন কমা ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণেও উন্নতি হয়েছে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ড. পেসাহ-পলাক বলেন, এই গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে সেমাগ্লুটাইড হয়তো বর্তমানে মদাসক্তি চিকিৎসায় অনুমোদিত ওষুধগুলোর চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে নালট্রেক্সোন, অ্যাক্যাম্প্রোসেট ও ডিসালফিরাম—এই তিনটি ওষুধই মদাসক্তির জন্য অনুমোদিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৫ শতাংশের সঙ্গেই মদাসক্তির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, স্থূলতা ও মদাসক্তি একসঙ্গে থাকলে লিভারের রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
তবে গবেষণাটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে হয়েছে, এতে বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী ছিলেন শ্বেতাঙ্গ এবং শুধুমাত্র স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে সাময়িক হালকা থেকে মাঝারি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা দেখা গেছে, যা এই শ্রেণির ওষুধে আগে থেকেই পরিচিত।
গবেষকেরা মনে করছেন, সেমাগ্লুটাইড মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ ও বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে প্রভাবিত করে মদ্যপান কমাতে পারে, তবে সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও, বৃহত্তর ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর আরও পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত সমাধান বলা যাচ্ছে না। সূত্র: এবিসি নিউজ
বিডিপ্রতিদিন/কেকে