ইসরাইলের আপত্তি থাকলেও নিজেদের জাতীয় স্বার্থে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন।
ভ্যান্স বলেন, তেল আবিব এই সিদ্ধান্ত পছন্দ করুক বা না করুক, ওয়াশিংটন নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ অনুযায়ী এগিয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে আমেরিকান জনগণের জন্য একটি বড় সাফল্য বা ‘হোম-রান উইন’ হিসেবে দেখছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, গত কয়েক মাসের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ইসরাইল ও ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এমন অবস্থান সামনে এলো। ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই চুক্তি ইসরাইলের পছন্দ হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। তবে মার্কিন প্রশাসন মনে করে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী হবে এবং এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই আমেরিকান জনগণ বর্তমান প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করেছে। সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকার কথাও স্বীকার করেন। তার ভাষায়, দুই দেশের মধ্যে অনেক অভিন্ন স্বার্থ থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। ভ্যান্স আরও ইঙ্গিত দেন, ওমানের মধ্যস্থতায় চলমান পরোক্ষ আলোচনায় তেহরানও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করে বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাব তুলে ধরছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো এবার কোনো দুর্বলতা রাখা হবে না। তার মতে, নতুন কোনো সমঝোতা হলে তা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে কঠোরভাবে যাচাই ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে।
এদিকে, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হলে ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়াই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তেল আবিবকে সম্পূর্ণ একাই লড়তে হতে পারে। গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনার মধ্যে সোমবার ট্রাম্পের এই কড়া বার্তা সামনে আসে। যদিও আপাতত উভয় পক্ষই হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে এবং ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরান ও ইসরাইল উভয় পক্ষকেই অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার আহ্বান জানান। পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুকে ফোন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘বিবি, তোমাকে আরও সতর্ক হতে হবে, অন্যথায় খুব শিগগিরই তুমি একদম একা হয়ে পড়বে।’ বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ড্রোন দিয়ে দুই ক্রুকে উদ্ধার : ওমান উপকূলে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ‘অ্যাপাচি’ যুদ্ধকালীন হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে কোনো বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ছাড়াই টহলরত ড্রোন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এর দুই ক্রু সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স জানান, আঞ্চলিক জলসীমায় নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি সাগরে ভেঙে পড়ে। এরপরই মার্কিন নৌবাহিনীর একটি সারফেস ড্রোন (জলযান) নিখোঁজ ক্রুদের খুঁজে বের করে এবং পানি থেকে উদ্ধার করে। এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ড্রোনটি মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের বিশেষ শাখা ‘টাস্ক ফোর্স ৫৯’-এর অধীনে পরিচালিত। ২০২১ সালে গঠিত এই টাস্ক ফোর্সটি মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোন চালিত বিশেষ দল।
আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ও দাফনের সময়সূচি ঘোষণা করল ইরান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য, জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি প্রকাশ করেছে দেশটির সরকার। পবিত্র মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন তথা আশুরার শোক পালন শেষে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘মেহের নিউজ’ এক প্রতিবেদনে জানায়, খামেনির স্মরণসভা আয়োজনে গঠিত বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি মঙ্গলবার তাদের দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতার জানাজা, দাফন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্মরণসভার প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। স্মরণসভা কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতি শহীদ নেতার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় অঙ্গীকার এবং শোকানুষ্ঠান পালনের প্রতি সম্মান জানিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, মহররমের প্রথম ১০ দিন শেষ হওয়ার পর তাঁর জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর বিমান হামলা শুরুর দিকে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছর ৬ মাস ধরে সফলতার সাথে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার পদে আসীন ছিলেন।
নতুন ফি আরোপ করে হরমুজ প্রণালী খুলছে ইরান-ওমান : বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে এবার ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন ট্রানজিট ফি বা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জলপথ ব্যবহারের জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন সেবার বিপরীতে এই ফি আদায় করা হবে। তবে কৌশলগত এই প্রণালীতে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুবাই থেকে একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছে বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স। যাত্রী নিরাপত্তা এবং আকাশসীমার ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বেশ কিছু বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট শিডিউল বাতিল বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কোনো কোনো এয়ারলাইন্সের এই স্থগিতাদেশ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সাম্প্রতিক সংঘাতের পর থেকেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইউরোপীয় এয়ারলাইন্সগুলো আকাশসীমা ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে তাদের ফ্লাইট পরিচালনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু এয়ারলাইন্স বিকল্প পথে ফ্লাইট চালু করার চেষ্টা করছে। যেমন, ‹এয়ার আস্তানা› আগামী ২০ জুন থেকে আলমাটি-দুবাই এবং ১০ জুলাই থেকে আস্তানা-দুবাই রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের আকাশসীমা এড়াতে তারা পাকিস্তানের উপর দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করবে বলে জানিয়েছে।
লেবাননের রক্ষায় ইরান ও হুথিদের পদক্ষেপের প্রশংসা হিজবুল্লাহর : ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো আগ্রাসন নয়, বরং এটি ছিল মূলত ‘লেবাননের সাধারণ মানুষের আত্মরক্ষার স্বার্থে’ এবং দেশটির প্রতি তেহরানের দীর্ঘদিনের ‘অঙ্গীকারের’ একটি স্পষ্ট বার্তা। এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ক্রমাগত অপরাধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। আর এই আগ্রাসনে সরাসরি উসকানি ও ‘মার্কিন প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থন’ ছিল। ইসরাইলের এই একতরফা চুক্তি লঙ্ঘনের পরই মূলত ইরান পাল্টা জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
অর্থমন্ত্রীসহ ২৬ ইসরাইলির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি ফ্রান্সের : অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও অবৈধ বসতি স্থাপনের অভিযোগে ইসরাইলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ফ্রান্স। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তিনি এখন থেকে ফ্রান্সে প্রবেশ করতে পারবেন না। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও উপনিবেশীকরণের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং নরওয়ের মতো মিত্রদেশগুলোর সাথে সমন্বয় করে এই যৌথ জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে প্যারিস। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী ছাড়াও দেশটির চারজন কট্টরপন্থী বসতি স্থাপনকারী নেতা এবং সহিংসতায় জড়িত ২১ জন ইসরাইলি নাগরিক রয়েছেন। সূত্র : তাস, সিএনএন, গালফ নিউজ, আল-জাজিরা।