কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল মিঠামইনে যাত্রীবাহী নৌকায় সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে আন্তজেলা ডাকাত চক্রের তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন এবং বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।



মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।



পুলিশ সুপার  মোহাম্মদ মিজানুর রহমান  জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন  জেলার মিঠামইন উপজেলার কাটখাল কাজীপাড়া গ্রামের মৃত ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. জুলহাস উদ্দিন (৪৪), বজকপুর গ্রামের মো. হারেছ মিয়ার ছেলে ইছানুল হক ওরফে এহসানুল হক ফকির (২৬) এবং বড়কান্দা মধুপুর গ্রামের মধু মিয়ার ছেলে রুবেল মিয়া (৩১)।



তিনি আরও জানান, তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় চুরি, মাদক এবং অন্যান্য অপরাধসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ আন্তজেলা ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।



সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, গত ৭ জুন জেলার  মিঠামইন উপজেলার মিঠামইন নৌঘাট থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২ জন যাত্রী নিয়ে একটি যাত্রীবাহী নৌকা করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা নৌঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথে সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে হাসানপুর ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌকাটি প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অবস্থান করতে বাধ্য হয়।



কিছু সময় পর আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে নৌকাটি পুনরায় গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু অল্প দূর এগোতেই ১০ থেকে ১২ জনের একটি মুখোশধারী সশস্ত্র ডাকাত দল একটি দ্রুতগামী ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে যাত্রীবাহী নৌকার পথরোধ করে। এরপর তারা রামদা, বল্লম ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নৌকার যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলে।



ডাকাতরা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে ডাকাত দল লুণ্ঠিত মালামাল নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।



ঘটনার পর মিঠামইন এলাকাসহ পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে গত ১৫ জুন ডাকাতির শিকার নৌকার মাঝি জামাল মিয়া বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।মামলা রুজুর পরপরই মিঠামইন থানা-পুলিশ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মোবাইল ট্র‍্যাকিং এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়।



অভিযানের প্রথম ধাপে গত সোমবার দুপুরে ঢাকার সাভার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইছানুল হক ওরফে এহসানুল হক ফকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. জুলহাস উদ্দিনকে আটক করা হয়।


পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের অপরাধী নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডাকাত দলের অন্যান্য সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে একই রাতেই মিঠামইন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ডাকাত দলের আরেক সদস্য রুবেল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।



অভিযান চলাকালে ডাকাত দলের একটি গোপন আস্তানায় তল্লাশি চালিয়ে লুণ্ঠিত পাঁচটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে একটি বাটন ফোন রয়েছে। এছাড়া ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত নৌকাটিও জব্দ করা হয়।



এ সময় উদ্ধার করা হয় ডাকাতদের ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র। জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ধারালো রামদা, লোহার রড এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি বল্লম। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা নৌযাত্রীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জিম্মি করেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।


পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান আরও  বলেন, হাওরাঞ্চলের নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ডাকাতি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্যও পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে।



সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) নাজমুস সাকিব, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শরিফুল হকসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।পুলিশের এই সফল অভিযানে মিঠামইনসহ হাওরাঞ্চলের সাধারণ নৌযাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।  একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ নৌ-ডাকাত চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের বিষয়টিও নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews