২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিল ফ্রান্স। শুরুর দিকে সমালোচনার মুখে পড়া মাসুর উসমান দেম্বেলে ও মাইক মেইনিয়ান নরওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। ফক্সবরোর জিলেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দেম্বেলের দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক এবং মেইনিয়ানের অসাধারণ গোলরক্ষণের নৈপুণ্যে নরওয়েকে অনায়াসে হারিয়েছে লে ব্লুরা। তবে ম্যাচজুড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতা ফরাসিদের ভাবিয়ে তুলেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফ্রান্স। খেলা শুরুর মাত্র ২২ সেকেন্ডের মাথায় কিলিয়ান এমবাপ্পের শক্তিশালী শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে গোলের আভাস মেলে। এরপর বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে ফরাসিরা। সেই ধারাবাহিকতায় উসমান দেম্বেলে মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নির্ধারণ করে দেন।
প্রথম গোলটিতে বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের পর ডান পায়ের জোরালো শটে জাল কাঁপান তিনি। এরপর পরপর দু’টি গোল করেন বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে, যেখানে নরওয়ের গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। তিনটি গোলেই ছিল তার অসাধারণ গতি, ভারসাম্য ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ।
গোল উদযাপনের সময় দুই হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করার ভঙ্গি করেন দেম্বেলে, যা ছিল সমালোচকদের উদ্দেশে প্রতীকী বার্তা। বিশ্বকাপের শুরুতে তার পারফরম্যান্স নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব তিনি দিয়েছেন মাঠের খেলাতেই। প্রতিবার বল তার পায়ে গেলেই দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম।
গোল না পেলেও ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে ছিলেন দলের আক্রমণের প্রধান কারিগর। দেম্বেলের দু’টি গোলে নিখুঁত অ্যাসিস্ট করেন তিনি। বিশেষ করে প্রথম অ্যাসিস্টটি ছিল অসাধারণ, যা নরওয়ের পুরো রক্ষণভাগকে মুহূর্তেই ভেঙে দেয়। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি সতীর্থদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, সামনে থেকে প্রেসিং করেছেন এবং প্রয়োজনে রক্ষণেও নেমে এসেছেন। অধিনায়ক হিসেবে তার দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স ফ্রান্সের জয়কে আরো সহজ করে তোলে।
আক্রমণে দেম্বেলে যতটা উজ্জ্বল ছিলেন, রক্ষণে ততটাই নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক মাইক মেইনিয়ান। নরওয়ে যখন ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছে, তখন জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনের নেয়া পেনাল্টি দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন তিনি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে অস্কার ববের নিশ্চিত গোলের সুযোগও অসাধারণ এক সেভে নষ্ট করে দেন। এছাড়া রক্ষণভাগের ভুলে তৈরি হওয়া আরো কয়েকটি বিপজ্জনক মুহূর্তে দ্রুত বেরিয়ে এসে দলকে রক্ষা করেন এই ফরাসি গোলরক্ষক। তার পারফরম্যান্সই প্রমাণ করেছে, বড় ম্যাচে তিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
তবে জয়ের মধ্যেও ফ্রান্সের রক্ষণভাগ খুব একটা স্বস্তি দিতে পারেনি। জুল কুন্দে একাধিকবার ভুল পাস দিয়ে নরওয়েকে সুযোগ করে দেন এবং আকাশে বলের লড়াইয়েও পিছিয়ে ছিলেন। দায়ো উপামেকানোও নিজের স্বাভাবিক দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি। নরওয়ের একমাত্র গোলে তার ভুলের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। থিও হার্নান্দেজ আবারো বক্সের ভেতরে ফাউল করে প্রতিপক্ষকে পেনাল্টি উপহার দেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে অস্কার ববের গতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খান।
মাঝমাঠে অরেলিয়েন চুয়ামেনি প্রথমার্ধে দারুণ খেললেও বিরতির পর কিছুটা ছন্দ হারান। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বল হারানোর পাশাপাশি একটি হলুদ কার্ডও দেখেন তিনি। অন্যদিকে মানু কোনে শুরু থেকেই প্রাণবন্ত ফুটবল খেলেন। বল পুনরুদ্ধার, আক্রমণ গঠন এবং মাঝমাঠে নিরলস পরিশ্রমে তিনি দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন। দেজিরে দুএও পুরো ম্যাচে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বারবার বিপাকে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত যোগ করা সময়ে হেড থেকে গোল করে নিজের পরিশ্রমের যথাযথ পুরস্কারও পান তিনি।
সব মিলিয়ে এই ম্যাচে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ছিল দুর্দান্ত, মাঝমাঠও ছিল কার্যকর। তবে রক্ষণভাগের দুর্বলতা ভবিষ্যতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে চিন্তার কারণ হতে পারে। তারপরও দেম্বেলের হ্যাটট্রিক, এমবাপ্পের নেতৃত্ব এবং মেইনিয়ানের অতিমানবীয় গোলরক্ষণ ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মাসুর উসমান দেম্বেলে ১৯৯৭ সালের ১৫ মে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের ভার্নন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ওয়ালি দিয়ানতাং মৌরিতানিয়া-সেনেগালি বংশোদ্ভূত এবং বাবা মালির বংশোদ্ভূত। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল অদম্য ভালোবাসা। অধিকাংশ সময়ই কাটত মাঠে। পরিবার তার সেই স্বপ্নকে সমর্থন করেছিল বলেই অল্প বয়সেই ফুটবলকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিতে পেরেছিলেন।
ম্যাডেলিন এভর ক্লাবে ফুটবলের প্রাথমিক শিক্ষা নেয়ার পর ২০১০ সালে রেনের অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন দেম্বেলে। ২০১৫ সালে রেনের মূল দলে অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তার পেশাদার ক্যারিয়ার। মাত্র এক মৌসুম পরই জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দেন। ২০১৭ সালে ১০ কোটি ৫০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন, যা সে সময়ের অন্যতম আলোচিত দলবদল ছিল। এরপর ২০২৩ সালে পাঁচ কোটি চার লাখ ইউরোর বিনিময়ে ফরাসি চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ে যোগ দেন তিনি।
ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে খেলার পর ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ইতালির বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক হয় দেম্বেলের। ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ রানার্সআপ ফ্রান্স দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গাতেই নিজের গতি, ড্রিবলিং, দুই পায়ে সমান দক্ষতা এবং সৃষ্টিশীল ফুটবলের জন্য তিনি বিশ্বসেরা উইঙ্গারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
ফুটবলের ঝলমলে জগতের একজন তারকা হলেও ব্যক্তিগত জীবনে উসমান দেম্বেলে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। মাঠের বাইরের জীবনকে তিনি সব সময়ই আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। ইসলামি মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষাই তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা দেম্বেলে কখনো নিজের শিকড় ভুলে যাননি। মৌরিতানিয়া, মালি ও সেনেগালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে ফরাসি সমাজে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাকে করেছে বিনয়ী ও সংযমী। বিশ্বজয়ী তারকা হওয়ার পরও ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন।
রমজান মাসে নিয়মিত রোজা পালন করেন দেম্বেলে। ইউরোপের ব্যস্ত ফুটবল সূচির মধ্যেও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করেন। তার মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস তাকে মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জোগায়। রোজা রেখে অনুশীলন ও ম্যাচ খেললেও কখনোই সেটিকে নিজের পারফরম্যান্সের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেন না।
খাদ্যাভ্যাসেও তিনি ইসলামি বিধান অনুসরণ করেন। হালাল খাবার গ্রহণে গুরুত্ব দেন এবং অ্যালকোহল ও ইসলামে নিষিদ্ধ খাবার থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সংযমকেই প্রাধান্য দেন।
২০২১ সালে মরক্কোর নাগরিক রিমা এডবাউচেকে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে করেন দেম্বেলে। আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান নয়, বরং পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিবেশে সম্পন্ন হয় তাদের বিয়ে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই কথা বলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিবারকে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চান না।
দেম্বেলে বিভিন্ন সময়ে দাতব্য কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা করলেও সেসব বিষয় প্রচার করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। নীরবে সাহায্য করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গার হওয়ার পাশাপাশি বিনয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংযমী জীবনযাপনের জন্যও উসমান দেম্বেলে ভক্তদের কাছে আলাদা মর্যাদা পেয়েছেন। মাঠে তার পায়ের জাদু যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করে, তেমনি মাঠের বাইরে তার ব্যক্তিত্বও তাকে অনন্য এক ফুটবলার হিসেবে পরিচিত করেছে।