কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বড় গরুর বাজারে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সিলেটের প্রবাসীদের ওপরই ভরসা করছেন মেহেরপুরের খামারিরা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় এবার বাইরের জেলা থেকে ব্যাপারীরা এসে ভালো দামে গরু কিনবেন—এমন আশায় রয়েছেন তারা।
গাংনী উপজেলার রাইপুর গ্রামের খামারি বদরুজ্জামান বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদে আটটি গরু ২১ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। সেই টাকা দিয়ে নতুন করে সাতটি গরু কিনে পালন করছেন। এবার ভালো দাম পেলে বসতঘর নির্মাণের স্বপ্ন পূরণ হবে তার।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ী আর সিলেটের প্রবাসীরাই বড় গরুর প্রধান ক্রেতা। এবার নির্বাচিত সরকার আছে, দেশের পরিস্থিতিও মোটামুটি স্থিতিশীল। তাই ভালো বেচাকেনার আশা করছি।”
তবে একই উপজেলার মড়কা গ্রামের খামারি সাজাহান আলী লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তিনি জানান, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। খৈল, বিচালি, ভুট্টা ভাঙা, ধানের গুঁড়া ও কাঁচা ঘাসের দাম বাড়ায় গরু পালনের খরচও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে গরুর দাম বাড়েনি।
সাজাহান আলী বলেন, প্রতি বছর কোরবানিকে সামনে রেখে তিনি ৩০টি গরু মোটাতাজা করেন। এবারও করেছেন। তার খামারে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে। গত বছর ২৪টি গরু বিক্রি করে সামান্য লাভ হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, গরু মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা হরমোন ব্যবহার করা হয়নি। দেশীয় খাবার দিয়েই গরু প্রস্তুত করা হয়েছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের খামারি ইলিয়াস আলী বলেন, তার খামারে ২৫টি বড় গরু রয়েছে, যার প্রতিটির দাম ৭ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে। অন্যান্য বছর চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ব্যাপারীরা এসে এসব গরু কিনে নিয়ে যেতেন। তবে গত কয়েক বছরের অস্থিরতায় বড় গরুর বাজারে কিছুটা ধস নেমেছিল।
অন্যদিকে সদর উপজেলার শালিকা গ্রামের খামারি রিপন হোসেন এবার বড় গরুর বদলে ছোট জাতের ৪০টি গরু পালন করেছেন। প্রতিটির দাম দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে। তার মতে, ছোট গরুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
খামারিরা জানান, গত বছরের লোকসানের কারণে অনেক ক্ষুদ্র খামারি এবার পশু পালন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জেলার ৩৫০টি বাণিজ্যিক খামার ও ২৮ হাজার পারিবারিক খামারে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৭০টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৪ হাজার গরু, ১ লাখ ১৫ হাজার ছাগল, ২ হাজার ভেড়া ও ১ হাজার মহিষ। জেলার চাহিদা প্রায় ৯০ হাজার পশু। বাকি পশু দেশের বিভিন্ন এলাকার হাটে বিক্রি হবে।
গত বছরের তুলনায় এবার বাণিজ্যিক ও পারিবারিক—উভয় ধরনের খামারের সংখ্যা কমেছে বলেও জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। খামারিদের মতে, খাদ্য ও শ্রমিকের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই পশুপালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মেহেরপুরে স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা নেই। হাটে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরীক্ষাগার থাকবে, যেখানে ক্রেতারা চাইলে পশু পরীক্ষা করাতে পারবেন।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, পশুর হাটগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তে প্রতিটি হাটে মেশিন বসানো হয়েছে। নগদ অর্থ পরিবহনে কেউ ঝুঁকি মনে করলে পুলিশি সহায়তা নিতে পারবেন।