প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গতকাল তারেক রহমান প্রথমবারের মতো মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করলেন। জেলা প্রশাসক হলেন মাঠ প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি। এই বৈঠকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপি সরকারের লক্ষ্য এবং পরিকল্পনা তুলে ধরলেন। একটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মাঠ প্রশাসন নয়, সরকারের প্রতিটি দপ্তরের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া একটি সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে না। এ কারণেই সব গণতান্ত্রিক দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঢেলে সাজায়। যেন, সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের সব পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সরকার মানে কেবল একটি মন্ত্রিসভা নয়। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যেকেই সরকার। একটি কুচকাওয়াজ যেমন ভালো হয় না, যদি সবাই এক তালে কদম মেলাতে না পারে ঠিক তেমনি একটি সরকার কখনো গতিশীল এবং সফল হতে পারে না যদি সরকার কাঠামোর সব পর্যায়ের সদস্য একসঙ্গে এবং একই তালে কাজ না করে। যেমন ধরা যাক, কৃষক কার্ড বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। এখন মাঠপর্যায়ের প্রশাসন যদি সঠিকভাবে কৃষকদের তালিকা তৈরি না করে, তাহলে এই চমৎকার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এ ধরনের উদ্যোগ অকার্যকর করতে কয়েকজন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাই যথেষ্ট। আবার যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে এই কার্ডে জালিয়াতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আজকাল যেকোনো বিষয় নিয়ে আদালতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কেউ যদি কৃষক কার্ড প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায়, আর আদালতে যদি ঘাপটি মেরে বসে থাকে কোনো বিরুদ্ধ মতের মানুষ, তাহলে তিনি একাই একটি রায় দিয়ে থামিয়ে দিতে পারেন এরকম একটি মহতী উদ্যোগের অগ্রযাত্রা। বিচার বিভাগ যদি কোনো কারণে  বৈরী হয় তাহলে সরকারের সব কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে যেমন নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়বে তেমনি, সরকারের কাজের গতি কমে যাবে। তাই একটি রাজনৈতিক সরকার তখনই সফল হয় যখন সরকার একসুরে কাজ করে। গণতান্ত্রিক সরকারকে মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মানুষের শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যদি সমানভাবে কাজ না করে তাহলে যেমন আমাদের চলাফেরা স্বাভাবিক হয় না। শরীরের যেকোনো একটি অঙ্গ যদি কাজ না করে তাহলে যেমন আমরা পরিপূর্ণ সুস্থ হিসেবে নিজেকে মনে করতে পারি না। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করতে পারি না, ঠিক তেমনই সরকারের সব অংশ যদি সমানভাবে কাজ না করে তাহলে সেই সরকার সফল হতে পারে না। এটাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল সূত্র।

একারণেই উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিবর্তন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় সরকারের সর্বস্তরের কর্মকর্তা। সেখানে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগসহ সব জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয় প্রেসিডেন্টের পছন্দের ব্যক্তিকে। যুক্তরাজ্যের তাই। এমনকি ভারতেও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তা। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর এটাই নিয়ম। একটা সময় মনে করা হতো সরকার পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে নিরপেক্ষ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এই মতবাদ এখন বাতিল হয়ে গেছে। কারণ সরকারের আসল জবাবদিহিতা হচ্ছে জনগণের কাছে। একটি নির্বাচিত সরকার এবং জনগণের মধ্যে চুক্তির দলিল হলো তার নির্বাচনি ইশতেহার। তাই সরকারের প্রধান কাজ হলো জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। সেটা পূরণ করতে না পারলে সেই সরকার ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই একটি সরকারকে সফল হতে হলে অবশ্যই তাকে সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। গত দুই মাসে প্রশাসনে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে কিছু রদবদল করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনেও কিছু রদবদলের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব রদবদল পর্যাপ্ত না। এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে এমন সব লোকজন, যারা শুধু বিএনপির মতাদর্শের বিরোধী নন, বিগত নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। এখন তারাই ভোল পাল্টে ফেলেছেন। বাইরে এরা যতই এখন শহীদ জিয়ার সৈনিক সাজুক না কেন, তারা বিএনপির ক্ষতি করার চেষ্টা করবে সুযোগ পেলেই।

২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ইউনূস ক্ষমতা নিয়েই সর্বস্তরে ব্যাপক পরিবর্তন করেন। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে সহকারী সচিব, পুলিশের আইজি থেকে থানার ওসি- সব পর্যায়ে রদবদল করা হয়েছিল। ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা। সেজন্য তিনি এমনভাবে সবকিছু সাজিয়েছিলেন যাতে নির্বাচনের পক্ষে কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকে। এসব রদবদল করা হয়েছে দুটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের তালিকা অনুযায়ী। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সচিবালয়ে অবস্থান করতেন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রদবদল করা হতো। অনেক উপদেষ্টা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জেলা প্রশাসক থেকে সচিব পর্যন্ত পদায়ন দিতেন। টাকার বিনিময়ে পদায়ন ছিল ইউনূস সরকারের সময়ে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এসব নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেসবকে পাত্তা দেয়নি। বরং, লোক দেখানো তদন্ত কমিটি করে সব দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে। তাই ইউনূস সরকারের আমলে যারাই বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের সততা এবং যোগ্যতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তার চেয়েও বড় কথা হলো, এমনভাবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজানো হয়েছিল যেন বিএনপি কোণঠাসা থাকে। সদ্য শেষ হওয়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এজন্য বলেছেন, একদল ছিল যমুনার ভিতর আরেক দল ছিল যমুনার সামনে। আরেকজন সংসদ সদস্য বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেছেন, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। ইউনূস সরকারের আমলে সরকার কাদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে সেটা আজ সবাই জানে।

ইউনূস সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি কলুষিত হয়েছিল আসিফ নজরুলের কর্তৃত্বে থাকা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়। নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগে আসিফ নজরুল চরম স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন।  এসবের অধিকাংশ পদায়নই লেনদেনের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত, সর্বত্র আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের লঙ্ঘন ও দুর্নীতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করে আসিফ নজরুল বিশেষ মহলকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন। নিম্ন আদালতে সরকারি আইনজীবী নিয়োগে নজিরবিহীন তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন আসিফ নজরুল। নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্য করে আসিফ নজরুল শত শত কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়েছে। কিন্তু এসবের ব?্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এখনো। তারচেয়েও বড় কথা হলো, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো এসব বিতর্কিত নিয়োগ প্রাপ্তরা আছেন বহাল তবিয়তে।

শুধু তাই নয়, বিতর্কিত উপদেষ্টাদের দুর্নীতি নিয়েও সরকার কথা বলছে না।

জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রশাসন দিয়ে নির্বাচিত সরকার চলতে পারে না। তা ছাড়া ইউনূস সরকার সবকিছু সাজিয়েছিলেন নির্বাচন বানচালের জন্য, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে। ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির, সাখাওয়াত হোসেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আসিফ নজরুলও সেই ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন বলেও প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। ইউনূস নিজেই বলেছিলেন জনগণ চায় তিনি আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকুন। এ ধরনের মন্তব্য এবং উপদেষ্টাদের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দিতে চায়নি, বাধ্য হয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমরা সেই আলোচনায় যেতে চাই না। কিন্তু এসব তথ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপিকে মাইনাস করতে চেষ্টা করেছিল। কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটই শুধু নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার ছিল। অন্যদের দাবি ছিল বিচার, সংস্কার শেষ করে তারপর হবে নির্বাচন। ইউনূস সরকার এক এগারোর মতোই বিরাজনীতিকীকরণের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সাজানো প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কখনোই বিএনপির পক্ষের নয়। বরং এরা চেষ্টা করবে কীভাবে দ্রত বিএনপিকে অজনপ্রিয় ও বিতর্কিত করা যায়। মনে রাখতে হবে, এক এগারোর কুশীলবরা এখনো সক্রিয়। শত চেষ্টা করেও তারা বিএনপিকে ধ্বংস করতে পারেনি- এই মনঃকষ্ট তাদের মধ্যে এখনো কাজ করছে। সে কারণে তারা সুযোগের অপেক্ষায়। এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হলে এবং বর্তমান সরকারকে সফল হতে হলে সরকারের ভিতর শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে এখনই। এর কোনো বিকল্প নেই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews