গত কিছুদিন ধরে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অব্যাহত পুশইনের চেষ্টা সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। বিজিবি ও সীমান্তের সাধারণ মানুষ তৎপর হয়ে বেশ কিছু পুশইন ঠেকিয়ে দিয়েছে। মূলত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই পুশইনের তৎপরতা বেড়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েই পুশইনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবৈধ নাগরিক ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া থাকলেও তা পাশ কাটিয়ে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএসএফ। ভারতের এমন আগ্রাসী আচরণের প্রতিবাদে এবং প্রচলিত নিয়ম মানতে ইতোমধ্যে দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক ডজনেরও বেশি চিঠি দিয়েছে ঢাকা। গত সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকার পুশইন মেনে নিচ্ছে না। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবৈধ নাগরিক ফেরত আনার একটি প্রক্রিয়া আছে। ভারতকে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এর বাইরে জোরপূর্বক পুশইন গ্রহণযোগ্য নয়। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে পুশইন নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেয়া হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দেশের বাইরে ব্যস্ত থাকায় তার অনুপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম পুশইনের ব্যাপারে কূটনৈতিক পন্থায় যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তার এ কাজ প্রশংসনীয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এমন অবস্থানের পরও ভারত ধারাবাহিকভাবে সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব হত্যাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না। তার এ বক্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপরাধ ও অনুপ্রবেশের অজুহাতে ‘সীমান্ত হত্যার’ সংজ্ঞা সংকুচিত করে এই গভীর সংকটকে হালকা করার চেষ্টা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কেউ দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হলে তাকে বর্ডার কিলিং বলা ঠিক হবে না। অথচ জাতিসংঘের মানবাধিকার নীতি এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিকের ওপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন বা নির্বিচার গুলি চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। পর্যবেক্ষকদের মতে, স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য বিএসএফের সীমান্ত হত্যাকে আরও উসকে দেবে। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারি নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের হত্যাযোগ্য করে তুলতে উৎসাহিত করবে। বিএসএফ যে প্রায় নিয়মিত নিরীহ বাংলাদেশীদের নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করছে, তার বক্তব্য তা বৈধতা উৎপাদন করছে। এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশে ভারতের পুশইন এবং তার অভ্যন্তরে মুসলমানদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যাসহ মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক স্থাপনা, মসজিদ ইত্যাদি গুঁড়িয়ে দেয়া কিংবা নাম পরিবর্তন করে হিন্দুয়ানি নাম রাখা নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ২০১৪ সালে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ ও মুসলিম সভ্যতার নামনিশানা মুছে ফেলার প্রক্রিয়া চালছে। ভারতের মুসলমানরা কী ধরনের আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তা সকলেরই জানা। ভারত সরকার তার জনগণকে নিয়ে কী করবে, সেটা তার আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তবে যখন প্রতিবেশি বিশেষ করে বাংলাদেশকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে লক্ষ্যে পরিণত করা হয়, তখন তা বাড়াবাড়ি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর আঘাত স্বরূপ। বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্যে বসবাস করে আসছে। এখানে কোনো হিন্দুকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় না কিংবা জোর করেও মুসলমান বানানো হয় না। ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশ হয়েও এখানে কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ এ বিবেচনা করা হয় না। রাষ্ট্রের চোখে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ সমান। বিচ্ছিন্ন ও আভ্যন্তরীণ কোনো ঘটনায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হলেও সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করে। তবে হিন্দুদের উপর হামলার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে ভারত যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর শামিল। অথচ ভারতে যে উগ্র হিন্দু ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমানদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও হত্যা এবং জোরপূর্বক হিন্দু বানানোর ঘটনায় বাংলাদেশ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এটিকে বাংলাদেশ ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখে। পুশইন নিয়ে ভারত বাংলাদেশের সাথে যে খোঁচাখুচি করছে, তাতে বোঝা যায়, সে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার প্রবণতা দেখাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে যে লাখ লাখ ভারতীয় কর্মরত, তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার যেকোনো সময় ভারতে ফেরত পাঠানোর অধিকার রাখে। সরকার তা করছে না। এটা সরকারের বন্ধুত্বসুলভ আচরণ। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে হিন্দুরা স্বাধীনভাবে বসাবাস করছে এবং ব্যাপক পরিসরে তাদের ধর্মকর্ম পালন করছে। এমনকি, তাদের দেবতাদের বিশাল আকৃতির মূর্তি বানাচ্ছে। এক্ষেত্রে, তারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলার হোসেনপুর ইউইনিয়নের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে ২৮ ফুট উচ্চতার শিবমূর্তি এবং ৫৩ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে দেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। এসব মূর্তি ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্নও উঠেছে, এই বিপুল অর্থ কোত্থেকে এলো, কে জোগান দিয়েছে? এ কথাও আলোচিত হচ্ছে, সেখানে বিদেশি কূটনৈতিক দল সফর করেছেন এবং তা তদারকিও করছেন। বাংলাদেশ যেহেতু সব ধর্মের সমান অধিকারের নীতি নিয়ে চলে, সেহেতু হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড করবে, তাতে আপত্তির কিছু নেই। তবে বিশাল অংকের প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের যোগান ও সেখানে কূটনৈতিক দলের ঘনঘন সফর নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধও করছে। ভারতের মুসলমানরা কি এখন এভাবে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের কথা চিন্তা করতে পারে?

গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে হিন্দুদের বিশালাকৃতির একাধিক মূর্তি বানানো নিয়ে হফাজতে ইসলামী এক বিবৃতিতে যথার্থ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। এ দেশের প্রত্যেক নাগরকি সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার অনুযায়ী, নিজ নিজ ধর্ম পালন করে। এটি আমাদের জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা সকল ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করি। তবে পলাশবাড়ির মতো ভৌগলিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বৃহৎ আকারের হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ, প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলের ঘনঘন পরিদর্শনের বিষয় পর্যালোচনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পর্যবেক্ষকদের মতে, জনমনে উত্থাপিত প্রশ্নের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা তার প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যদি দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার, সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট বা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের কৌশলগত জটিলতার আশঙ্কা সৃষ্টি করে, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া জরুরি। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের উদাসীতার সুযোগ নেই। বলা বাহুল্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা বা ধর্ম পালনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড এবং যা জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করে, তা খতিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব। পলাশবাড়িতে হিন্দুদের দেবতামূর্তি নির্মাণ প্রকল্প হুট করে যে হয়নি, তা বলা বাহুল্য। সেখানে বিদেশি কূটনৈতিক দলের ঘনঘন পরিদর্শন বা তদারকির বিষয়টিও স্বাভাবিক নয়। এটা কূটনীতিকদের দায়িত্বও নয়। এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিৎ। ঢাকঢাক গুড়গুড় না করে স্বচ্ছতার সাথে বিষয়গুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করা জরুরি। তা না করায়, এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক সংকটও দেখা দিতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসকসহ প্রত্যেকেকেই এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ভারত সীমান্তে পুশইন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং দেশের অভ্যন্তরেও সক্রিয় হয়ে বাংলাদেশে একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে। সরকারকে তা অনুধাবন করে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews