যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের দূরপাল্লার টমাহক ক্রুজ মিসাইল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পেন্টাগন যে হারে এই মিসাইল ব্যবহার করছে, সেই তুলনায় তা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ম্যাকলেস্টার কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির সিনিয়র ফেলো ড. অ্যান্ড্রু ল্যাথাম এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই ভাণ্ডার যে গতিতে শেষ হচ্ছে, তা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের কৌশলগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের দমনে মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে টমাহক মিসাইল ব্যবহার করছে। আপাতদৃষ্টিতে এই অভিযানগুলো সফল মনে হলেও এর নেপথ্যে গভীর সংকট তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটন যে কোনো সংঘাতের শুরুতে স্থলবাহিনী পাঠানোর পরিবর্তে এই প্রিসিশন বা নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র ব্যবহারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারকরা যেকোনো সংকটে সবার আগে টমাহকের কথা ভাবেন কিন্তু এই সম্পদ যে ফুরিয়ে আসছে তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।

ড. ল্যাথাম তার বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, টমাহক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রায়থিয়নের উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে বেশ সীমিত। এই মিসাইলের অনেক খুচরা যন্ত্রাংশ মাত্র একটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে আসে এবং এটি তৈরিতে যে বিশেষায়িত শ্রমিকের প্রয়োজন, তাদের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। ফলে চাইলেই হুট করে উৎপাদন বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থায় উৎপাদনের যে বেশি পরিমাণে উৎপাদন প্রয়োজন, বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোর পক্ষে তা সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় যখন একই সাথে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রের কথা আসে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সাথে সম্ভাব্য কোনো সংঘাত শুরু হলে সেখানে দূরপাল্লার এই মিসাইলগুলোই হবে আমেরিকার প্রধান হাতিয়ার। বিশাল সমুদ্র পথ অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তখন হাজার হাজার টমাহকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত এই মিসাইল খরচ করার ফলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা সবসময়ই এমনভাবে করা হয় যেন তারা বিশ্বের একাধিক প্রান্তে একযোগে যুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু ল্যাথামের মতে, এই পরিকল্পনা কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে যাচ্ছে। কারণ, তাদের অস্ত্রাগার সেই সক্ষমতা সমর্থন করছে না। একবার যদি যুদ্ধের ময়দানে মিসাইলের এই ঘাটতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তবে সেটি আর কেবল লজিস্টিক সমস্যা থাকবে না। তখন মার্কিন জেনারেলদের বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হবে তারা ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে নাকি চীনা জাহাজে।

একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে অনেক সময় একাধিকবার আঘাত করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু পুনর্নির্মিত হলে সেখানে আবারও হামলার প্রয়োজন পড়ে। ফলে বাস্তব যুদ্ধে পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র ব্যবহৃত হয়। ওয়াশিংটন বর্তমানে এমন এক ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে আছে যে, সংকট বাড়লে অর্থ ঢেলে বা নতুন চুক্তি করে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। বাস্তবতা হলো, একটি টমাহক মিসাইল তৈরি করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় এবং এর সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল।

এই পরিস্থিতি মার্কিন কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। যখন অস্ত্রের মজুদ সীমিত থাকে, তখন কোন লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হবে আর কোনটি বাদ দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় অবশিষ্ট মিসাইলের সংখ্যা। এর ফলে শত্রুপক্ষ আমেরিকার এই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার সাহস পেতে পারে। কৌশলগত এই সীমাবদ্ধতা যুদ্ধের ময়দানে আমেরিকান কমান্ডারদের হাত বেঁধে দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে দেশটির অবস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ।

ড. ল্যাথাম সতর্ক করেছেন, শুধু উচ্চাভিলাষী সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদের মজুদও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ব্যবহারের হারের মধ্যে যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কমিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় কোনো সংকটে আমেরিকাকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। 



বিডি প্রতিদিন/নাজমুল



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews