পবিত্র ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিন পটুয়াখালীতে গ্রামের বাড়ি গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ফিরোজা বেগম (৬৫)। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। ফিরোজা বেগমের ছেলে শাহজালাল অনিক বলেন, ‘পটুয়াখালীতে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় মাকে নিয়ে আসার জন্য আমি ঢাকা থেকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রওনা দিই। কিন্তু পটুয়াখালী শহরে প্রবেশের ঠিক আগে চালক হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দেন। চালক বলেন, শহরের ভিতরে ঢুকলে ভাড়ার ১৭ হাজার টাকার মধ্যে ১০ হাজার টাকাই স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতিকে দিতে হবে। তাই রোগীকে শহরের বাইরে নিয়ে এসে গাড়িতে তুলতে বলেন। কোনোভাবেই তাকে রাজি করাতে না পেরে মাকে আরেকটি গাড়িতে শহরের বাইরে নিয়ে এসে তারপর অ্যাম্বুলেন্সে উঠানো হয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় হাসপাতাল ঘিরে তৈরি হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনরা। শহরভিত্তিক গড়ে উঠেছে আলাদা সিন্ডিকেট। এক শহর থেকে অন্য শহরে রোগী পৌঁছে দিতে পারলেও সেখান থেকে রোগী নিয়ে যেতে পারবে না। হাসপাতাল চত্বরেই রোগী ও স্বজনদের ঘিরে চলে দরকষাকষি। ৫০০ টাকার জন্য শিশুর প্রাণ যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৮ মার্চ কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সঙ্গে ৫০০ টাকার ভাড়া নিয়ে বিরোধে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে থেকে চিকিৎসা না পেয়ে এক নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। মারা যাওয়া ওই নবজাতক কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের মীরপাড়া গ্রামের মো. রোহানের সন্তান। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তি দাবি করে বিক্ষোভ করেন রোগীর স্বজনরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স জরুরি সেবায় নিয়োজিত তাই এ খাতে শৃঙ্খলা জরুরি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপারিশ করা হয়েছে। এই সেবাকে সিন্ডিকেট মুক্ত করতে অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোর মতো অ্যাপস চালু করতে হবে। তাহলে মানুষ প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে গন্তব্য কিংবা ভাড়া নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ থাকবে না। অ্যাম্বুলেন্স চালকদেরও হাসপাতাল চত্বরে রোগীর আশায় বসে থাকতে হবে না। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় রোগী নেওয়ার জন্য বসে থাকার কারণেই অ্যাম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে।’ গত ১৩ জানুয়ারি শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে রোগী ঢাকা নেওয়ার পথে দুই দফায় রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরপর সেই রোগী ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছার আগে মারা যান। মৃত জমশেদ আলী ঢালী ডামুড্যা উপজেলার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা। রোগীর স্বজনরা জানান, সদর হাসপাতালে জমশেদ আলীর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। স্থানীয় একটি অ্যাম্বুলেন্স ৬ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া ঠিক করে রোগী ওঠানোর পর আরও বেশি ভাড়া দাবি করে অ্যাম্বুলেন্স চালক। পরে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স ৫ হাজার টাকায় ভাড়া করে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথে গাড়ির গতিরোধ করে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সিন্ডিকেটের সাত-আটজন ব্যক্তি। এ সময় প্রায় ৩০ মিনিট বাগ্বিতণ্ডা হলে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেন তারা। এরপর চালক অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়ে পুনরায় ঢাকা যাওয়ার জন্য রওনা হলে পথিমধ্যে জামতলা এলাকায় আবারও তাদের থামিয়ে রোগী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘ ৪০ মিনিট পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় গাড়িটি ছেড়ে দিলেও পথিমধ্যেই মারা যায় রোগী। পরে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতব্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বহিরাগত কিছু দালাল অ্যাম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা করছে। এজন্য অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শরীয়তপুরের ঘটনাসহ অন্য ঘটনাগুলো খোঁজ নিয়ে দেখেছি। এই খাতকে সুশৃঙ্খল করতে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’ মাইক্রোবাসকে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরে কিছু মাইক্রোবাস অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে চলছে। এসব গাড়ি মাইক্রোর নম্বর ব্যবহার করছে, অ্যাম্বুলেন্সের না।’ ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে রয়েছে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। সারা দেশে তাদের মোট অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। এগুলোর বাইরে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যক্তিমালিকানায় কতগুলো অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে তার সঠিক হিসাব কারও কাছেই নেই। দেশে যেসব অ্যাম্বুলেন্সকে পথেঘাটে ছুটোছুটি করতে দেখা যায় সেগুলোর প্রায় শতভাগই মূলত অ্যাম্বুলেন্স নয়। এগুলোর বেশির ভাগই মাইক্রোবাস কেটে বানানো। ভিতরে লক্কড়ঝক্কড় একটি ট্রলি ছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বলতে তেমন কিছুই থাকে না। রাজনৈতিক পরিচয়, বিআরটিএ এবং পুলিশকে ম্যানেজ করে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সেবার নামে এই বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিআরটিএ সূত্র জানায়, প্রতিটি যানেরই একটি রেজিস্ট্রেশন আছে, যার নম্বরকে প্রচলিত অর্থে নম্বর প্লেট বলা হয়। সেখানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ‘ছ’ সিরিয়াল নির্ধারণ করা আছে। শুধু ‘ছ’ সিরিয়ালই নয়, এর সঙ্গে মূল নম্বরের আগে ‘৭১’ অথবা ‘৭৪’ ও ‘৭৫’ যোগ হয়। এর বাইরে কোনো নম্বরযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স দেখা গেলেই বুঝতে হবে সেটি মাইক্রোবাস কেটে তৈরি করা এবং প্রকৃত অ্যাম্বুলেন্স নয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews