প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দীর্ঘমেয়াদি অবকাশকালীন ছুটিতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যার ফলে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত বিশেষ এই আদালতের নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। দেশের অন্য সব প্রচলিত আদালতের মতো এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালেও ছুটির নিয়ম চালু করতে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধিতে সংশোধন আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, ২০ দিনের এই অবকাশকালীন নিয়মিত এজলাস না বসলেও আদালতের দাফতরিক এবং অত্যন্ত জরুরি রুটিন কাজগুলো পুরোপুরি সচল থাকবে।

গত ১৭ মে অনুমোদিত এই সংশোধনী অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধির ৫৯ (এ) ধারায় ‘অবকাশ’ শব্দবন্ধটি সংযোজন করা হয়েছে। নতুন যুক্ত হওয়া চারটি উপধারার নিয়ম অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল ও রেজিস্ট্রি প্রতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই এবং ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অবকাশ পালন করবে। তবে বিচারপ্রার্থীদের আইনি সুবিধার কথা মাথায় রেখে অবকাশকালীন সময়েও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম কমপক্ষে একজন সদস্য অথবা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক অব্যাহত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিশেষ সময়ে দায়িত্ব পালনকারী চেয়ারম্যান বা সদস্য বছরের অন্য যেকোনো মাসে নিজের সুবিধাজনক সময়ে সমপরিমাণ অবকাশ বা ছুটি ভোগ করার আইনি অধিকার পাবেন।

কার্যবিধির সংশোধনীতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আরো বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও অন্য কর্মচারীরা এই অবকাশকালীন সময়ে পালাক্রমে (রোস্টার ডিউটি) দায়িত্ব পালন করবেন। অবকাশের সময় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করবেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বা রেজিস্ট্রার। এ ছাড়া জুলাই ও ডিসেম্বরের এই নির্ধারিত অবকাশ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সাধারণ বা বিশেষ সময়ে অন্য যেসব ছুটি ও সরকারি অবকাশ ভোগ করেন, তার সমপরিমাণ সুযোগ ও সুবিধা ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও ভোগ করতে পারবেন।

আদালতকে একটি সম্পূর্ণ ‘আলাদা সত্তা’ হিসেবে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান আইনি কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, ট্রাইব্যুনাল আইনের নিজস্ব কার্যবিধি সুনির্দিষ্টভাবে সংশোধন করার মাধ্যমেই এই ছুটির আইনি ব্যবস্থাটি বৈধ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে ছুটির বিষয়ে প্রসিকিউটর মো: মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের পর থেকে দীর্ঘ দেড় দশকে এই ছুটির কোনো বিধান বা প্রথা ছিল না। এর আগে সাধারণ সরকারি ছুটি ও ব্যক্তিগত ছুটি ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি যৌথ ছুটিতে ট্রাইব্যুনাল কখনো যায়নি। এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি সংযোজন।’

অবকাশের সময় বিচারিক প্রক্রিয়া স্থবির হবে না জানিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই ছুটিতেও জরুরি কিছু আইনি কাজ সচল থাকবে। যেমন তদন্তের স্বার্থে কাউকে নতুন করে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হলে কিংবা আদালতের নির্দেশে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদে নেয়ার প্রয়োজন হলে, সেই সম্পর্কিত ছোটখাটো বা জরুরি আইনি প্রক্রিয়াগুলো যথানিয়মেই চলতে থাকবে।

একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ (আইন), ১৯৭৩-এর আওতায় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তৎকালীন সময়ে ক্ষমতাসীন দল ছিল আওয়ামী লীগ। শুরুতে তিন সদস্যের একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরো একটি ট্রাইব্যুনাল (ট্রাইব্যুনাল-২) গঠন করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক পরিক্রমায় এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৪৪টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ১১টি মামলার চূড়ান্ত রায় এসেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর উচ্চ আদালতের আপিলসহ সব আইনি প্রক্রিয়া ও আইনি প্রতিকার শেষে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এ পর্যন্ত ছয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে; যাদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতা। যদিও ওই বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মামলার চাপ কমে আসায় ২০১৫ সালের শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল-২ অকার্যকর বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তবে ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক কার্যক্রম নিয়মিত চলমান ছিল।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বিশেষ আদালতের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলন এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়কালে সংঘটিত অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই একই ট্রাইব্যুনালে করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রথমে ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন করা হয়। পরবর্তীতে নতুন অসংখ্য মামলার বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল ও দ্রুততর করতে গত বছরের ৮ মে ট্রাইব্যুনাল-২ পুনরায় গঠন করে সরকার।

পুনর্গঠিত এই দুটি ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দায়েরকৃত চারটি মামলার রায় দিয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ এই চার মামলার রায়ে এ পর্যন্ত ১৩ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩ জন আসামিকে তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও সাজা দেয়া হয়েছে এবং একজন আসামি আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ক্ষমা পেয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালের বর্তমান কর্মযজ্ঞ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সার্বিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গতকাল শনিবার চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দু’টি ট্রাইব্যুনালে পুরোদমে বিচারকাজ চলছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০টি বড় মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আমাদের দফতরে আসছে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের কারণে একটি মামলা পুরোপুরি নিষ্পত্তি করতে আমাদের কমপক্ষে তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যাচ্ছে। কিছু কিছু জটিল মামলার ক্ষেত্রে আরো কম বা বেশি সময়ও লাগে। স্বাভাবিক গতিতে আইনি নিয়ম মেনে যেভাবে বিচারকার্য চলার কথা, আমরা ঠিক সেভাবেই করছি।

মামলার চাপ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যদিও মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়তই বেশ দ্রুততার সাথে বাড়ছে এবং তদন্ত সংস্থা থেকে প্রতিবেদনও নিয়মিত দাখিল হচ্ছে। তাই এই মাত্র দু’টি ট্রাইব্যুনালের পক্ষে একটা সময়ে গিয়ে এসব অতিরিক্ত মামলার চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই যৌক্তিক কারণেই ভবিষ্যতে বিচারিক গতি ধরে রাখতে ট্রাইব্যুনাল ও প্রসিকিউশন টিমের পরিধি ও সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই সাথে বাড়ানো হতে পারে তদন্ত সংস্থার দক্ষ কর্মকর্তার সংখ্যাও।’

নিজে দায়িত্ব নেয়ার পর বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষায় কয়েকটি মামলা পুনঃতদন্তে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত সততা এবং কঠোর নিরপেক্ষতার সাথে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ার গতি আরো বাড়ানোর চেষ্টা করব আমরা। তবে চিফ প্রসিকিউটরের অত্যন্ত দায়িত্বশীল আসনটিতে বসার পর এ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয়টি মামলার প্রাথমিক প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হওয়ায় আমি সেগুলো পুনরায় অধিকতর তদন্তে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে কিছু কিছু মামলার পুনঃতদন্ত সম্পন্ন হয়ে ইতোমধ্যে পুনরায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন ডেস্কে দাখিল করা হয়েছে।’

প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকটি মামলা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করার চেষ্টা করছি যেন কোনোভাবেই ভুল তথ্য না আসে, বরং সম্পূর্ণ সঠিক ও নির্ভুল প্রতিবেদন আদালতে পেশ করা সম্ভব হয়। আমার হাত দিয়ে কোনো একজন নিরীহ মানুষও যেন বিন্দুমাত্র হয়রানি বা অবিচারের শিকার না হন সেটি নিশ্চিত করা আমার পবিত্র দায়িত্ব। আবার একই সাথে কোনো প্রকৃত দোষী বা অপরাধীও যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো অবস্থাতেই রেহাই না পান, তা-ও আমরা কঠোরভাবে দেখছি।’ জনমনে বিচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নিজের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার পুরো দল নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন আমাদের সামনে আসা একটি অভিযোগও প্রতিহিংসামূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ভুয়া প্রমাণিত না হয়। অর্থাৎ এই ট্রাইব্যুনালের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বা কোনো মামলা যেন জনমনে কোনো প্রকার বিতর্কের জন্ম না দেয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews