প্রবাদ আছে, ‘এক দেশের গালি, আরেক দেশের বুলি।’ অর্থাৎ কোনো দেশ বা অঞ্চলে যে শব্দ গালি হিসেবে বিবেচিত হয়, সেটি অন্য কোথাও হয়তো ভালো অর্থে ব্যবহৃত হয়। সমাজে ভালো কথা বা আচরণে যেমন মানুষের পরিচয়, ব্যক্তিত্ব, বংশমর্যাদা প্রতিফলিত হয়, গালি বা শ্রবণকটু কথাও তেমন ব্যক্তির পারিবারিক শিক্ষা-সংস্কৃতির দীনতা ফুটিয়ে তোলে। সে কারণেই অনেক গণপরিবহন বা রেস্টুরেন্টে লেখা থাকে ‘ব্যবহারেই বংশের পরিচয়’। আবার আরেকটি প্রবাদও ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়, ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো।’ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের নানান বিবর্তন ও পরিস্থিতির মাঝে মানুষকে চলতে হয়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেক খানদানি, বংশীয়, শিক্ষিত পরিবারের সন্তানও নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক নিম্ন, অচ্ছুত পরিবারের সন্তানও সবার মুখ উজ্জ্বল করে। আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এমন বাস্তবতার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। রাজনীতিরও অনেক ভাষা আছে। কোনো নেতার বক্তৃতা শোনার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করেন। কোনো কোনো নেতার বক্তৃতা স্মরণীর বাণীর মতো মানুষ মনে রাখে। গালি নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। সেই গালির আবার নারী-পুরুষের ভেদাভেদও আছে। কোনো গালি একজন পুরুষ অবলীলায় দিতে পারেন। কিন্তু ওই গালি মুখে উচ্চারণ দূরের কথা, শুনলেও অনেক নারী লজ্জিত, কুণ্ঠিত হন। কিন্তু এখন চলছে এলোমেলো এক সময়। যে যত বেশি গালি দিতে পারে, যেন সে-ই তত বেশি জনপ্রিয়। তার গালি তত বেশি ভাইরাল। নারীরাও কেউ কেউ এখন পুরুষের চেয়ে বেশি অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে গালি দিচ্ছেন। গালাগাল বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায়ই বস্তির মানুষকে টেনে আনা হয়। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী যেসব শব্দ ব্যবহার করে কথা বলেন বা একজন আরেকজনকে গালাগাল করেন, তা শুনে বস্তির মানুষও কান চেপে রাখছে। গালিগালাজের বর্তমান জেনারেশন দেশ ও জাতিকে কী দিতে পারবে জানি না, তবে এর দায় কাউকে না কাউকে বহন করতে হবে। কারণ প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা চিরন্তন ব্যবস্থা আছে। সেটা আমরা কেউ হয়তো বুঝতে পারি, কেউ পারি না। তবে এড়ানোর উপায় নেই।
‘খানকির বাচ্চা স্বাস্থ্যমন্ত্রী, একটা হাসপাতালের Infrastructure ঠিক নাই, ব্যাসিক জিনিস নাই, হাইজিন ঠিক নাই। কোনো কিছুর টাইমটেবিল নাই। কোনো অভিযোগ সিস্টেমও অ্যাকটিভ নাই, ওগুলো কর।’ ফেসবুকে এ স্ট্যাটাসটি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী। তার নাম ইসরাত জাহান গয়না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের আবাসিক এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী। যতদূর জানা গেছে, ওই শিক্ষার্থীর বাড়ি চাঁদপুরে। তার এই স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত শালীনভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হাসান আল মামুন জবাব দিয়েছেন। তিনি গয়নাকে বোন সম্বোধন করে স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘বোন, এই সরকারের দুই মাসও হয়নি। এই অল্প সময়ের মধ্যে নতুন হসপিটাল নির্মাণ কি সম্ভব? সমালোচনার ভাষা অনেক রকম হতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে আরেকজন শিক্ষিত মানুষকে খানকির বাচ্চা গালি দেওয়া কি সুশিক্ষার মধ্যে পড়ে? প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম এবং দেশের মানুষের কাছে বিচার দিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে লজ্জিত হলাম।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন সিনিয়র সিটিজেন। একজন বিশিষ্টজন, একজন রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা। চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চালাকচর ইউনিয়নের হাফিজপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সরদার পরিবারের সন্তান। তাঁর পরিবার অত্যন্ত বনেদি। নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের তিনি জিএস ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এমন একজন মানুষকে এ ভাষায় গালি দেওয়া যায় কি না সেটাই বিচার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বর্তমান শিক্ষার্থী আরেকজন সাবেক শিক্ষার্থীকে এ ভাষায় গালি দিতে পারেন কি? এটা কোনো শিক্ষা বা শালীনতার মধ্যে পড়ে? স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, তখন বর্তমান শিক্ষার্থী গয়নার বাবারও হয়তো জন্ম হয়নি। বিনা অপরাধে, শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার দায়ে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোককে যে ভাষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থী গালি দিলেন, তাতে তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করা খুবই যৌক্তিক। সবচেয়ে বড় কথা, যে মেয়েটি আজ প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত অবস্থায় সমাজমাধ্যমে নিজেকে এভাবে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করলেন, তার কাছ থেকে দেশ কী আশা করতে পারে? যে বাবা তাঁর কষ্টে উপার্জিত টাকা মেয়েকে মানুষ করার জন্য খরচ করছেন, সেই বাবা কি জানেন তাঁর মেয়ে কতটা এবং কী ধরনের মানুষ হচ্ছে? সেই বাবার আদুরে মেয়ে একদিন কারও না কারও স্ত্রী হবেন, কারও না কারও পুত্রবধূ হবেন, কারও না কারও মা হবেন। তার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি এমনকি তার সন্তানরা কি তার কাছ থেকে ভালো কিছু পাবে? নাকি নষ্ট মানুষ নষ্ট করবে স্বামী, শ্বশুরের সংসার। নষ্ট বীজ থেকে যদি আরেক নষ্ট প্রজন্মের জন্ম হয়, তাহলে এ দায় কার?
আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের অশালীন, অসভ্য গালাগালি চর্চার প্রচলন অনেক বেশি বেড়েছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী সময়ে এত নতুন-পুরাতন গালি দেশবাসী শিক্ষিত তরুণদের মুখে শুনেছে, যা বিগত ৫৫ বছরে শোনা যায়নি। অভ্যুত্থানের সুফল হলো বন্যার পানিমিশ্রিত পলির মতো, যা বন্যা-পরবর্তী বাম্পার ফলনে সহায়তা করে। আর বন্যার পানির সঙ্গে কিছু ময়লা-আবর্জনাও ভেসে বেড়ায়। গালাগালি করে রাজনীতিতে বিখ্যাত হওয়ার বা ভাইরাল হওয়ার যে প্রাপ্তি অর্জিত হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে চব্বিশের অভ্যুত্থানে আমরা পলির চেয়ে ময়লা-আবর্জনাই বেশি পেয়েছি। এমন অশ্লীল, অভদ্র, অশ্রাব্য গালি যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইসরাত জাহান গয়না দিচ্ছেন তা নয়, চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় আরও অনেক শিক্ষিত মানুষ নানা রকম গালির কারণে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। গালি দিতে দিতে অনেকেই রাজনৈতিক নেতা হয়ে গেছেন। নানান মেজাজে, নানান অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ গালির কারণে ভাইরাল হয়েছেন অনেকে। মানুষ অনেক কারণে বিখ্যাত হয়। বিখ্যাত মানুষের প্রভাবে সমাজ আলোকিত হয়। আর ভাইরাল গালির কারণে যারা সমাজমাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন তারা সমাজকে কতটা কলুষিত করেছেন, তা এখন অনুধাবন করা যাচ্ছে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গালি এখন স্কুলের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরাও অবলীলায় বলে যাচ্ছে। যেন এক নতুন গালির সংস্কৃতিতে ভাসছে দেশ। গালিগালাজের এই বিস্তার কোনো একক কারণে নয়। এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত প্রভাব এবং মানুষের ভিতরের বিশৃঙ্খল আবেগগত চাপের সম্মিলিত ফল। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। কারণ যখন ভদ্রতার জায়গা দখল করে গালি বা অপমানজনক ভাষা, তখন সমাজের কাঠামো দুর্বল হয় এবং বিভাজনের ক্ষত গভীর হয়। সেই ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত করে। একটা সময় ছিল যখন আলোচনা-আড্ডায় স্থান পেত ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই বা আরও পরের দশকের বিখ্যাত গান, নাটক, সিনেমা বা আলোকিত কোনো মানুষের গল্প। আর এখন শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় স্থান পাচ্ছে কে কত বিচ্ছিরি, কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে কত জঘন্য গালি দিতে পারে। কার গালি কতটা উচ্চণ্ড, দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম এবং তথাকথিত ‘আর্টিস্টিক’, সেই প্রতিযোগিতা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
দেশে এখন নানান সংকট চলছে। এ সংকট বৈশ্বিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক। কোনোটার চেয়ে কোনোটা কম নয়। দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল। তারা দেশটাকে রীতিমতো শাসন, শোষণ, লুটপাট করেছে। নিজেদের মতো করে সবকিছু করেছে। সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। গুমখুন, ব্যাংক লুট, বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ দেশবাসীর ন্যূনতম মৌলিক অধিকার ছিল না বললেই চলে। সবকিছুতে এবং সব ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, দুঃশাসন, স্বৈরাচারী আচরণের কারণে চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটতে বাধ্য হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও দেশকে বিশেষ ভালো কিছু দিতে পারেনি। গরিবের পোশাক পরা জগদ্বিখ্যাত মানুষটির লোভের ভয়াবহ চিত্র এখন দেশবাসীর সামনে এক এক করে প্রকাশিত হচ্ছে। একটি নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধুচন্দ্রিমার দুুই মাস মাত্র অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নানান সংকটে পড়তে হয়েছে সরকারকে। সবচেয়ে বেশি সংকট এখন জ্বালানি নিয়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান যুদ্ধের কারণে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপরও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। সেখানেও বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমাদের দেশের অর্থনীতি অনেক বছর ধরেই ভঙ্গুর। এমন অবস্থায় আমাদের জন্য সময়টা এখন অতীব ক্রান্তিকাল।
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এককভাবে পরিচালিত হয় না। পরিবারের মধ্যেও বিভাজন থাকে। সরকারি দল থাকে, বিরোধী দল থাকে। এর মধ্যে কোনো পরিবার সুখের সাগরে ভাসে, আবার কোনো পরিবারে জ্বলতে থাকে অশান্তির আগুন। কোনো পরিবারে হাসি, আনন্দ, দুঃখ সবাই ভাগ করে নেয়; আবার কোনো পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী দৃশ্যমান বস্তুর চেয়ে শক্তিশালী হলো যৌগ পদার্থ। এর চেয়ে শক্তিশালী হলো অণু, তারপর পরমাণু এবং সর্বশেষ হলো প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন। অর্থাৎ কোনো দৃশ্যমান বস্তুকে যত বেশি ভাঙা হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে। আর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের শক্তি চলে পদার্থবিজ্ঞানের উল্টো পথে। না ভেঙে যত বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকা যাবে তত বেশি শক্তিশালী হওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে শক্তির কেন্দ্র হলো একতা ও দেশপ্রেম। দেশের যেকোনো সংকট উত্তরণে একতা ও দেশপ্রেমের বিকল্প নেই। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে দিনদিন ভারতপ্রেমী, পাকিস্তানপ্রেমী, যুক্তরাষ্ট্রপ্রেমী, তুরস্কপ্রেমী, সৌদিপ্রেমী, ইরানপ্রেমী লোকের সংখ্যা বাড়ছে। সেই অনুপাতে বাংলাদেশপ্রেমী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। দরকার বাংলাদেশপ্রেমী মানুষ। এখন দরকার একতা। গালাগালি বর্জন করে আলোকিত, দেশপ্রেমিক আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে। কারণ অনেক আগাছার চেয়ে একটি ফলদ উদ্ভিদ অনেক মূল্যবান।
♦ লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন