প্রতিবছর ১৬ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব কণ্ঠ দিবস। কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কণ্ঠজনিত সমস্যার প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তোলাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৯৯ সালে ব্রাজিলিয়ান সোসাইটি অব ভয়েস প্রথম-এ উদ্যোগ গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব ল্যারিংগোলজি এতে একাত্মতা প্রকাশ করলে দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন কণ্ঠ স্বাস্থ্য রক্ষা, কণ্ঠনির্ভর পেশাজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কণ্ঠ পুনর্বাসনে কাজ করে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জন্য বিশ্ব কণ্ঠ দিবসের প্রতিপাদ্য (থিম) নির্ধারণ করা হয়েছে “Caring for Our Voices”-যা একটি সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বান। এখানে “caring” শব্দটি দৈনন্দিন জীবনে কণ্ঠের সঠিক যত্নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। আর “our voices” আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-কণ্ঠ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষক, সাংবাদিক, উপস্থাপক, চিকিৎসক কিংবা কণ্ঠশিল্পী-অনেক পেশাতেই কণ্ঠই প্রধান কর্ম-উপকরণ। তাই কণ্ঠ সুস্থ থাকা মানে শুধু ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নয়, বরং কার্যকর যোগাযোগ এবং পেশাগত দক্ষতা বজায় রাখার অপরিহার্য শর্ত।
কণ্ঠের যত্ন কেন জরুরি
আমাদের গলার সামনের দিকে শব্দযন্ত্র অবস্থিত। শব্দ যন্ত্রে দুটি কণ্ঠনালি থাকে। কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে ভাবনা ও অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। এ নালি দুটির কম্পনের মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ১০ লক্ষ বার কণ্ঠনালি দুটির স্পর্শ ঘটে।
শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো কণ্ঠনালিরও নিয়মিত যত্ন প্রয়োজন। কণ্ঠের অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কণ্ঠনির্ভর পেশাজীবীদের প্রায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কণ্ঠজনিত সমস্যায় ভোগেন, যা তাদের কাজের দক্ষতা ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কণ্ঠের যত্নে করণীয়
উচ্চস্বরে কথা বলা এড়িয়ে চলুন : অযথা চিৎকার বা উচ্চস্বরে কথা বললে ভোকাল কর্ডে চাপ পড়ে এবং স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। শব্দপূর্ণ পরিবেশে মাইক ব্যবহার করা উত্তম।
অ্যালার্জি ও কাশি নিয়ন্ত্রণে রাখুন : অ্যালার্জি, কাশি বা পোস্টনাজাল ড্রিপ গলা বসে যাওয়ার অন্যতম কারণ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করুন : ধূমপান কণ্ঠনালির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে কণ্ঠনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয় এড়িয়ে চলুন : বিশেষ করে গরমের পর হঠাৎ ঠান্ডা পানি পান গলার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গরম বাষ্প (স্টিম ইনহেলেশন) কণ্ঠনালি আর্দ্র রাখতে সহায়ক।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন : পানিশূন্যতা গলা ভাঙার অন্যতম কারণ। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা উচিত।
কণ্ঠ আমাদের প্রকাশের মাধ্যম, পেশার হাতিয়ার এবং ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সচেতনতা ও ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই কণ্ঠকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি) নাক-কান-গলা বিভাগ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।