চরম সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি। তার চেয়েও সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অতি সম্প্রতি প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। অপরদিকে, সরকার রয়েছে আর্থিক চাপে। সরকারকে অর্থের জোগান দিতে গিয়ে বেসরকারি খাত থেকে ঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে, নতুবা টাকা ছাপাতে হবে। ফলে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এমন অবস্থায় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ৫৫তম বাজেট পেশ করবেন, যার আকার ৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশাল এই বাজেট দেশের অর্থনীতিতে কতটা গতি সঞ্চার করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অর্থনীতি সচল করতে না পারলে সাধারণ মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটবে না। অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক স্থির অবস্থায় বিরাজ করছে; এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রবণতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি না, তা ভাববার বিষয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে, যা একটি দুষ্টচক্রের মতো আবর্তিত হয়ে প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবে। অপরদিকে, সরকারের এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাধ্য হয়ে ভ্যাট-শুল্ক বৃদ্ধি করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের আয়ের ওপর। অর্থাৎ, এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিতে পারে। সুতরাং, জাতীয় বাজেটে মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।

বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি যৌক্তিক বিষয়। কিন্তু এই যৌক্তিকতা এখনো বাস্তব চিত্রের সাথে মিল পাওয়া যায়নি। কারণ, কিছুদিন আগেও তেলের পাম্পগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দৃশ্যমান ছিল। সরকার বলছে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, কিন্তু কেন যেন সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা কাজ করেছে। সরকার এখানে ব্যর্থ না হলেও সফল হতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও সেখানে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে, আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। যখন মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল, তখন তা না করে মজুতদারদের সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, আর পরে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

আমাদের দেশে মূল্যবৃদ্ধি দুষ্টচক্রে আটকে যায়। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন আমাদের দেশে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য সমন্বয় না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নামে বিলম্ব করা হয় বা কখনো কখনো সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিয়ে তাদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। বাজারে সিন্ডিকেটবাজরা মজুত শেষ করলে তখন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। ঠিক ওই সময় দেখা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে বা কমে গেছে। আবার আমাদের দেশে একবার মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সহজে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে না। এই অপসংস্কৃতি থেকে দেশকে বের করতে হবে। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়: ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা কমলেও সেই অনুপাতে পরিবহন ভাড়া কমানো হয়নি। অথচ, আবার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ১১ পয়সা, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে।

আরও একটি উদাহরণ যায়: ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ভোজ্য তেল, আটা-ময়দার দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে আলুর দাম প্রায় ১০০ টাকায় পৌঁছালে এই দোহাই দিয়ে তখন সিঙ্গাড়ার দাম ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে আটা-ময়দা বা ভোজ্য তেলের দাম কিছুটা কমলেও এবং আলুর দাম ২০ টাকায় নেমে এলেও সিঙ্গাড়ার দাম এখনো ১০ টাকাই রয়েছে। এর তদারকি বা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির পেছনে বাজার সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গও এর জন্য দায়ী। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার ফলে এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। আরও একটি উদাহরণ: ধরা যাক, ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হবে, যেখানে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু আলোচ্য বিষয় যেহেতু মূল্যস্ফীতি, তাই একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটে সরকার কম করে হলেও এক লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে বা ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করবে। ফলে ওই টাকা সরকারের খরচের মাধ্যমে আবার জনগণের মধ্যে ফিরে আসবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ চরমভাবে হ্রাস পাবে বা বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু বড় বড় ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঠিকই ঋণ পাবেন, যা দিয়ে দেশে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বা নতুন উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ প্রদান করে, তবেই দেশে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। সুতরাং, উচ্চ বিলাসী বাজেট পরিহার করা উচিত। বর্তমান সরকার যদি বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে একটি সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করে, তবে তা অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

অপরদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ‘মূল্যস্ফীতি সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না’ বলে দাবি করেছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি আরও বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তা অত্যন্ত সামান্য।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছেÑ ডিজেলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটি শিল্পকারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন (উৎপাদন খরচ) থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ শতাংশকে যদি ১০০ শতাংশ ধরি, তার ১৫ শতাংশ ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে।’ মন্ত্রী হয়তো সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। যদি তাই হয়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এখানে তিনি সরল সুদের মতো একটি সরল হিসাব করেছেন, যেখানে চক্রবৃদ্ধি প্রভাবটি উপেক্ষিত হয়েছে। জ্বালানি তেল শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ায় না; কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবহন ও বাজারজাতকরণÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব লক্ষণীয়। সুতরাং, চক্রবৃদ্ধির এই প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তবে সাধারণ জনগণ যেন সহজ হিসাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মূল্যস্ফীতি তাদের নাগালের মধ্যেই থাকে।

সরকার যেমন চাপে আছে, তেমনি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও বিপদে আছে। এক মাসে দুইবার এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। এই লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে কার্যকর জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেটে আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেল ঘোষণা বা বাস্তবায়ন। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া আকাশচুম্বী পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অনেকটা ‘দিল্লির লাড্ডু’-এর মতো অবস্থা। বাস্তবায়ন করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে পস্তাতে হবে, আর বাস্তবায়ন না করলেও বর্তমান সরকার বিপদে পড়তে পারে। সুতরাং, সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews