বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাম্প্রতিক তথ্য এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের প্রায় ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশই নাগরিককে নিজস্ব পকেট থেকে মেটাতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে এ হার কোনোভাবেই ৩২ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে সরকারি ব্যয় বা বিমাব্যবস্থা থেকে নাগরিকরা খুব সামান্যই সুবিধা পাচ্ছেন, যার ফলে চিকিৎসার সিংহভাগ দায় এসে পড়ছে ব্যক্তির নিজের পকেটে। সুস্থতা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই অধিকার আজ এক বিরাট আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  অসুস্থ হওয়ার ভয় আর চিকিৎসার ব্যয় এখন সমার্থক। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই নির্মম বাস্তবতার পেছনে মূল খলনায়ক হলো ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্স’-এর উচ্চহার। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, দেশে চিকিৎসাসেবার খরচ বহন করতে গিয়ে মানুষকে নিজের পকেট থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়, যার হার বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত আউট অব পকেট এক্সপেন্সের ফলে দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের শিকার হচ্ছে। অসুস্থতার কারণে অনেকে সঞ্চয় হারাচ্ছেন, ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছেন এমনকি সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে দরিদ্র হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এখনো সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, পকেটের এই বিপুল অর্থ আসলে যাচ্ছে কোথায়? গবেষণায় দেখা গেছে, একজন রোগীর পকেটের খরচের সবচেয়ে বড় অংশ- প্রায় ৬৪ থেকে ৬৭ শতাংশই চলে যায় ওষুধ কেনা এবং রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায়। সরকারি হাসপাতালে হয়তো চিকিৎসকের পরামর্শ বা হাসপাতালের বেড ফ্রি পাওয়া যায়, কিন্তু অধিকাংশ জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী রোগীকে বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেসরকারি ল্যাবরেটরিগুলোর উচ্চ ফি। কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো মনগড়া মূল্যে সেবা বিক্রি করছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেয়ে ওষুধ বিক্রির ওপর বেশি নির্ভরশীল। পরিসংখ্যানের আয়নায় তাকালে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এ ক্ষতটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক মোট ব্যয় মাত্র ৫৪ থেকে ৬০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা)। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়, বিশেষ করে মালদ্বীপে এই বরাদ্দ যেখানে ১ হাজার ডলারের ওপরে, সেখানে আমাদের এই অঙ্ক অত্যন্ত অপ্রতুল। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মোট ব্যয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের মাথাপিছু বার্ষিক অবদান মাত্র ১ হাজার ৭০ টাকা। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বছরের পর বছর ধরে জিডিপির মাত্র ০.৭ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম সুপারিশ অন্তত ৫ শতাংশ থাকা উচিত। একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সাজানোগোছানো সংসার বিপর্যস্ত হওয়ার জন্য একটি বড় অসুখই যথেষ্ট। ক্যানসার, কিডনি জটিলতা কিংবা হৃদরোগের মতো কোনো বড় ব্যাধি যখন পরিবারের কোনো সদস্যের শরীরে বাসা বাঁধে, তখন কেবল শারীরিক কষ্টই নয়; শুরু হয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়। জমি বিক্রি, সঞ্চয়পত্র ভাঙানো কিংবা সুদের ওপর ঋণ নিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর দেশের লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসায় অভাবনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধির পরও সাধারণ মানুষের একটিই দীর্ঘশ্বাস- চিকিৎসা খরচের বোঝা আর বইতে পারছি না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই নির্মম বাস্তবতার পেছনে মূল কারণ হলো ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্স’ বা চিকিৎসা নিতে গিয়ে নাগরিকের নিজস্ব পকেট থেকে খরচের উচ্চহার। এই চিকিৎসা ব্যয়ের উচ্চহারের কারণে সমাজে এক নীরব বঞ্চনা তৈরি হচ্ছে। গবেষণা তথ্য বলছে, অর্থাভাব, যাতায়াতসহ নানা সংকটের কারণে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশই অপূরণীয় বা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই বঞ্চনার হার শহরে ৫৯ শতাংশ হলেও গ্রামে তা আরও ভয়াবহ- প্রায় ৬৮ শতাংশ। গ্রামীণ অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ টাকার অভাবে রোগ পুষে রাখছে, যা পরবর্তী সময়ে জটিল আকার ধারণ করছে। একই সঙ্গে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি এবং উন্নত সেবার আশায় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বিদেশে বিশেষ করে ভারতে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দেশ থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও এক বড় ধাক্কা। স্বাস্থ্য খাতের এই ক্ষত নিরাময়ে অবিলম্বে কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যার মধ্যে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা, ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ানোসহ দুর্নীতির অবসান অন্যতম। পকেটের খরচের চাপ কমাতে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা চালু করা। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবী থেকে শুরু করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এই বিমার আওতায় আনা। সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধের শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ডায়াগনস্টিক টেস্টের ফি এবং হাসপাতালের সেবামূল্য নির্ধারণ ও তা কঠোরভাবে তদারকি করার জন্য একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি বডি গঠন করা প্রয়োজন। প্রান্তিক পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের কোনো নাগরিক যাতে নিঃস্ব না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্স’ কমিয়ে এনে একটি সাশ্রয়ী ও বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে  তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত এই সত্যটি উপলব্ধি করবেন, দেশের সাধারণ মানুষের মঙ্গল তত দ্রুত ত্বরান্বিত হবে। তবে আশার কথা হলো সরকার নাগরিকদের জন্য হেলথ কার্ড চালুর চিন্তা করছে। এর মধ্যে পুষ্টির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে পারলে ভালো হয়।

লেখক : গবেষক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews