ভারতের সাথে বাংলাদেশের সদ্য ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্পর্ক অতীতে কখনোই স্বস্তিদায়ক ছিলো না বরং অবিশ্বাস-বিশ্বাস, সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। ১৯৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগ ছাড়া কোন সরকারের সাথেই ভারতের সাথে সম্পর্ক তেমন হৃদ্যতাপূর্ণ হয়নি। জাতীয় পার্টির ৯ বছর উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক লুকোচুরি ও চোরাবালির বৃত্তেই আবদ্ধ ছিলো। মূলত, বাংলাদেশের যে সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীন সত্তা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেয়েছে, সে সরকারের সাথেই বৈরিতা সৃষ্টি করেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। আসলে ভারত আমাদের স্বাধীন সত্তাকেই কখনোই স্বীকার করেনি। ফলে দেশটি বরাবরই এদেশে একটি মেরুদণ্ডহীন ও সেবাদাস শক্তিকেই ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে। এক্ষেত্রে বরাবরই সফলতা দেখিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগ। তাই ভারতের প্রথম পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিই হচ্ছে আওয়ামী লীগ। যা অতীতে যেমন প্রমাণিত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে এখনো এর কোন ব্যত্যয় ঘটছে না। তবে সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিএনপি সরকার গঠনের পর ভারত দৃশ্যত কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে।
স্বাধীনতাত্তোর আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কটা বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ হলেও এক পাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিলো। সে সময় দু’দেশের মধ্যে যতগুলো চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিলো সবগুলোই ছিলো ভারতীয় স্বার্থের অনুকূলে। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারত বাংলাদেশে যে লুটতরাজ চালিয়েছিলো সে ক্ষেত্রে আওয়ামী সরকার ছিলো নীরব দর্শক। তাই সে সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ ছিলো বলা যায়। আর এর ছন্দপতন ঘটেছিলো ১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত পট পরিবর্তনের মাধ্যমে। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। একই সাথে তার ছিলো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। যা আধিপত্যবাদী ভারতের জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিলো না। বিশেষ করে তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে উভয় দেশের সরকারের মধ্যে বড় ধরনের মনোমলিন্য সৃষ্টি হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এক্ষেত্রে রীতিমত আপসহীন। কিন্তু এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছার আগেই তাকে রহস্যজনকভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। ফলে দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের পিছু ছাড়েনি।
এরপর ১৯৮২ সালে এক সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে রাতের আধারে ক্ষমতা দখল করেছিলেন অতি উচ্চাভিলাষী সেনা শাসক জেনারেল এরশাদ। এ কাজ করতে তাকে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং আওয়ামী লীগের আনুকূল্য নিতে হয়েছিলো। মূলত, দীর্ঘ ৯ বছর আওয়ামী লীগ ও ভারতকে হাতে রেখেই স্বৈরাচারি হয়ে উঠেছিলেন জেনারেল এরশাদ। কিন্তু তাদের এ মধুচন্দ্রিমা খুব বেশি দীর্ঘায়িত করা যায়নি বরং ১৯৯০ সালে দুর্বার গণআন্দোলনের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের পতন হয় এবং ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ভারতের সাথে সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। এর কারণ ছিলো বিএনপি নেত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার স্বাধীনচেতা ও আপসহীন মনোভাব। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। সে মেয়াদের পুরো ৫ বছরই ভারতের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কে চলে আসে নতুন উচ্চতায়। কিন্তু সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে নয় বরং ছিলো পুরোপুরি একপেশে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কে তৈরি হয় বড় ধরনের তিক্ততা। ধারণা করা হয় যে, আওয়ামী ষড়যন্ত্র ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের আনুকূল্যের কারণে ২০০৬ সাথে ১/১১-এর পেক্ষাপট সৃষ্টি করা হয়। সে ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় একটি অসাংবিধানিক জরুরি সরকারকে ক্ষমতায় আনা হয়। এ সরকার আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আনে। আর তাদের এ ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন করতেই ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এ অপশাসন ও দুঃশাসন স্থায়ি হয় দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এ বিপ্লবকে দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের লজ্জাজনক পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং সে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণ করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি জোট সরকার গঠন করে এবং বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ও বিজয়ী হয়। এমতাবস্থায় নব গঠিত বিএনপি সরকারের সাথে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সম্পর্ক কেমন তা-ই আজকের আলোচনার বিষয়।
জুলাই বিপ্লবের পর ভারত আমাদের দেশে একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচনের দাবি করে আসছিল বরাবরই। তারা আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়েই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু যখন আওয়ামী লীগ ৩টি নির্বাচন একতরফাভাবে করেছিলো, তখন কিন্তু তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অমৃত বচন শোনান নি। যা ভারতের মত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য রীতিমত স্ববিরোধীতা। যাহোক তাদের সে দাবির প্রতি আমাদের সম্মান রাখা সম্ভব হয়নি বরং আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বরং বরাবরই ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টের ধারক-বাহক বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তাই নতুন সরকারের সাথে দেশটির সম্পর্ক কেমন হবে তা নিয়ে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বিষয়টিকে নানাভাবেই বিশ্লেষণ করছেন।
মূলত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর ভারতের পক্ষ থেকে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে, তাতে ছিল সতর্ক উষ্ণতা। বাংলায় দেয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এ ‘নির্ণায়ক বিজয়ী’র জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশীর পাশে থাকার অঙ্গীকার করে মোদি বলেন, তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে নিবিড়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী। দৃশ্যত, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা ইতিবাচক মনে হলেও রাজনৈতিক বোদ্ধামহল বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কারণ, ভারত যা করে তা বলে না; যা বলে তা করে না। মূলত, বিপত্তিটা সেখানেই।
রাজনৈতিক বোদ্ধামহল বলছে, মোদির এ বার্তার সুর ছিল ইতিবাচক হলেও বেশ সাবধানী। কারণ, ভারত যেমন বিএনপিকে বিশ্বাস করতে পারে না; বিএনপির মনোভাব প্রায় একই বলেই মনে হয়।। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন-জি নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে দু’প্রতিবেশীর সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থন দিয়ে দিল্লি বড় ধরনের ভুল করেছে। তারা বাংলাদেশের জনগণকে আস্থায় নেয়নি বরং আওয়ামী লীগের সাথে বরাবরই সখ্যতা গড়ে তুলেছে। এর সাথে সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য বাধা এবং উসকানিমূলক বাগাড়ম্বরের মতো পুরনো ক্ষোভগুলোও যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত পারাপারের ট্রেন-বাস বন্ধ এবং বিমান চলাচলও সীমিত ভারতের সাথে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করছে, দিল্লির জন্য এখন প্রশ্নটি ‘বিএনপির সাথে যোগাযোগ করা হবে কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো, ‘কিভাবে’ তা করা হবে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ দমন এবং কথিত চরমপন্থা রোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলার যে প্রবণতা, তা প্রশমিত করাই এখন দিল্লির সবেচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের এ পুনর্গঠন বা রিসেট সম্ভব, তবে এর জন্য সংযম ও পারস্পরিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘নির্বাচনী ময়দানে থাকা দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী। ভারতের জন্য এখন বিএনপিই সবচেয়ে নিরাপদ বাজি।’ তবে তারেক রহমান কিভাবে দেশ শাসন করেন এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে পারেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
দিল্লির কাছে বিএনপি কোনো অজানা বা অষ্পষ্ট শক্তি নয়। ২০০১ সালে তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটেছিল। সে সময় ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র প্রথম বিদেশী কূটনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানালেও আস্থা দানা বাঁধেনি বরং মনোস্তাত্বিক দুরত্বটা আগের তুলনায় বেড়েছিলো। বিএনপি ওয়াশিংটন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে যেভাবে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, তাতে দিল্লির সন্দেহ ছিল যে ঢাকা কৌশলগতভাবে ভারতের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সে সময় ভারতের দু’টি ‘রেড লাইন’ লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ ওঠেছিলো। তা হলো, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের সমর্থন এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা। বিশেষ করে ২০০৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম অস্ত্র চালান এবং ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত ছিল বলে অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ২০০৮ সালে গ্যাস নিয়ে মতভেদের কারণে টাটা গ্রুপের ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
বিএনপির সাথে এ তিক্ত অভিজ্ঞতাই ভারতকে শেখ হাসিনার ওপর অতিমাত্রায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছিল। ১৫ বছরের শাসনামলে হাসিনা দিল্লিকে সেটিই দিয়েছিলেন, যা তারা সবচেয়ে বেশি চেয়েছিল: বিদ্রোহ দমনে নিরাপত্তা সহযোগিতা, কানেক্টিভিটি এবং চীনের বদলে ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকা একটি সরকার। বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নের দায়ে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ি, সে সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪শ মানুষ নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল বিষয়টিকে গণহত্যা হিসাবে বিবেচনা করে। এমনতাবস্থায় ভারতকে এখন ঢাকার নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কারণ, দণ্ডিতকে সে দেশে আশ্রয় দেওয়া আন্তর্জাতিক মহল ভালো চোখে দেখছে না। বিষয়টি ভারতকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
উল্লেখ্য, গত মাসে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করেন এবং তারেক রহমানের সাথে দেখা করেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয় সবার আগে বাংলাদেশ।’ এটি দিল্লি এবং রাওয়ালপিন্ডি উভয় থেকেই নিজেদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার একটি পরিষ্কার বার্তা।
অবশ্য শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ১৪ বছর পর গত মাসে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে এবং দু’দেশের বাণিজ্য গত এক বছরে ২৭ শতাংশ বেড়েছে। দিল্লিভিত্তিক আইডিএসএর স্মৃতি পট্টনায়েক বিবিসিকে বলেন, ‘সার্বভৌম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু শেখ হাসিনা আমলে এ সম্পৃক্ততা একেবারেই ছিল না। এখন পেন্ডুলামটি এক দিক থেকে পুরোপুরি উল্টো দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার নির্বাসন এবং ভারতে থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি বড় কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, যদি দিল্লি ভারত থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করে, তবে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবে।
অভিযোগ রয়েছে যে, একশ্রেণির ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও টেলিভিশন স্টুডিওগুলোর উসকানিমূলক মন্তব্য বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে। আইপিএল-এ বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের নিষিদ্ধ করার মতো ঘটনাগুলোও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এত অস্থিরতা সত্ত্বেও ভূগোল ও অর্থনীতি দু’দেশকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে। চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করা অসম্ভব। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অধ্যাপক পালিওয়াল মনে করেন, ‘তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখাচ্ছেন যাতে অতীত ভবিষ্যতের শত্রু না হয়। দিল্লিও বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততার জন্য প্রস্তুত।’ শ্রীরাধা দত্তের মতে, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই প্রথম হাত বাড়াতে হবে। শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের এই ‘রিসেট’ বাগাড়ম্বরের চেয়ে আস্থার ওপরই বেশি নির্ভর করবে।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ভারত আমাদের নিকট ও বৃহত প্রতিবেশি। তাই যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক দেশটির সাথে উষ্ণ সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উভয় দেশের স্বার্থেই অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তা হতে হবে পরস্পর সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, ভারত কি অতীত দাদাগিরির অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে, আর প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া কি পারবেন তার পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য ও আত্মমর্যদার অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কি আস্থার সংকট দুর হবে? অবশ্য সময়ই সবকিছু বলে দেবে!
www.syedmasud.com