জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর একদিন না যেতেই বাজারে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী। এতে বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। নিু ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আজ মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত টাস্কফোর্স কমিটি। নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখতে কমিটি জরুরিভিত্তিতে পাঁচটি উদ্যোগ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে জোর দিবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। 

জ্বালানির তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। নানা কৌশল ও কারসাজির আশ্রয় নিয়ে তারা পণ্যমূল্য বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বস্তা ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সোমবার সকালে খুচরা পর্যায়ে প্রতিবস্তা (২৫ কেজি) মিনিকেট চাল মানভেদে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একদিন আগেও এই চাল মানভেদে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রেতারা চালের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। ইতোমধ্যে ঢাকার বাদামতলী ও কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও দিনাজপুরের মোকামগুলোতে চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একযোগে নিত্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি অশুভ প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করছে। 

এমন বাস্তবতায় স্বল্পমেয়াদে ও দ্রুত সময়ে একটি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পাঁচটি উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই পাঁচ উদ্যোগ হচ্ছে-বাজার তদারকিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, সরবরাহ চেইন সচল রাখা ও পরিবহণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকিযুক্ত বিক্রি বিশেষ করে টিসিবি, খোলাবাজারে বিক্রি কার্যক্রম-ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা, আমদানি সহজ করা, ডলার সংকট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সব ধরনের উৎপাদন খরচ কমাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে সেটি আগেই বোঝা গেছে। আর এ কারণেই হয়তো এতদিন জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। তবে বৈশ্বিক সংকটের কারণে সারাবিশ্বে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ভর্তুকি কমিয়ে আনতে শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হলো। তবে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে যাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবমুক্ত থাকে সেজন্য দ্রুত কিছু বিষয়ে কাজ করবে সরকার। মূলত এগুলো নিয়েই টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে। এই মিটিংয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। তাদের সবার পরামর্শ নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হবে। কেউ যাতে পণ্য মজুতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ না পায় সেদিকে বেশি নজর রাখা হবে। 

এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহণ খাতে। ফলে পণ্য বাজারে পৌঁছাতে খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে। এজন্য স্বল্পমেয়াদে নিত্যপণ্য পরিবহণে বিশেষ সুবিধা প্রদান, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ভাড়া মনিটরিংয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সরবরাহ চেইন যত দ্রুত ও মসৃণ হবে, বাজারে তত দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহণ ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় তারা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম সমন্বয় করছেন। তবে ভোক্তারা মনে করছেন, এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করছে। 

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের তুলনায় বেশিরভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চাল, ডিম, মুরগি ও সবজির দাম বৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর সর্বশেষ হিসাবে সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি প্রায় ৮-১২ টাকা, ডিম (ডজন) ১০-১৫ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৫-২৫ টাকা, মসুর ডাল কেজিতে ৫-১০ টাকা এবং চাল (মাঝারি মান) কেজিতে ৩-৪ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এছাড়া সবজির বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একদিনের ব্যবধানে কেজিতে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.২৪ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানো মানেই পুরো অর্থনীতিতে ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়া। এটি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ তৈরি করে, যার ফলে সব পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকে, তাহলে এ খাতের সিন্ডিকেট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তাই সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, শুধু বাজার তদারকি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন খরচ কমাতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ডলার সংকট ও এলসি জটিলতা দূর না করলে আমদানি বাড়বে না, ফলে বাজারে চাপ থেকেই যাবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews