বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে গত এক দশকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীরগতির কারণে সরকার ক্রমবর্ধমানভাবে আমদানিকৃত তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিকৃত তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানার চাহিদা পূরণে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মোট ৮৬টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এসব কার্গোর জন্য সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা (ডলারের গড় বিনিময় হার ১২০ টাকা ধরে)। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানির পরিমাণ ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে এবং এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের বছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৫৫ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে মোট আমদানিকৃত এলএনজির জ্বালানি মূল্য ছিল প্রায় ৩৫০.৭৭ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ। সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানি ব্যয় আনুমানিক ১.৪ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা, প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) হতে পারে।
দেশীয় গ্যাসের সঙ্কট
বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটেরও বেশি। বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৯০ কোটি থেকে ২০০ ঘনফুটের মতো। ফলে প্রতিদিনই বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই ঘাটতির কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানা এবং আবাসিক খাতের গ্রাহকদের গ্যাস সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বেশির ভাগ বড় গ্যাসক্ষেত্র ইতোমধ্যে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম না থাকায় উৎপাদন ঘাটতি আরো প্রকট হয়েছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিকৃত তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানার চাহিদা পূরণে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মোট ৮৬টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এসব কার্গোর জন্য সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা (ডলারের গড় বিনিময় হার ১২০ টাকা ধরে)। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানির পরিমাণ ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে এবং এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের বছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৫৫ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে মোট আমদানিকৃত এলএনজির জ্বালানি মূল্য ছিল প্রায় ৩৫০.৭৭ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ। সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানি ব্যয় আনুমানিক ১.৪ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা, প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) হতে পারে।
এলএনজির দিকে ঝুঁকে পড়া
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু করে। বর্তমানে কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়। এলএনজি আমদানির ফলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এর অর্থনৈতিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বিপুল আর্থিক চাপে পড়তে হয়েছিল। এমনকি কয়েক দফা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনাও বন্ধ রাখতে হয়। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এলএনজি থেকে আসছে। কিন্তু এই আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ
এলএনজি আমদানির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল ব্যয়। প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ডলারের রিজার্ভ সঙ্কটের সময় এ ব্যয় আরো বড় চাপ সৃষ্টি করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি একই পরিমাণ অর্থ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ অধিক লাভবান হতে পারত। কারণ দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের খরচ আমদানিকৃত এলএনজির তুলনায় অনেক কম।
অনুসন্ধানে পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, গত এক দশকে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নতুন কূপ খননের গতি প্রত্যাশিত ছিল না। দেশের স্থলভাগে এবং বিশেষ করে সমুদ্রসীমায় বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনুসন্ধান কার্যক্রম ধীরগতির। বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির পর নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনাবিষ্কৃত এলাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের অভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতিরিক্ত এলএনজি নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার কারণে দেশের জ্বালানি ব্যয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সঙ্কট বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। চতুর্থত, উচ্চমূল্যের গ্যাসের কারণে শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা রফতানি প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দেশীয় অনুসন্ধানের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র অঞ্চলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপ, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা বাড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী করা, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে দেশীয় অনুসন্ধান কার্যক্রমকে গতিশীল করা সম্ভব।
সমন্বিত জ্বালানি নীতির প্রয়োজন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এককভাবে এলএনজি বা দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী জ্বালানি নীতি প্রয়োজন। এই নীতিতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি; অফশোর ব্লকগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধানের আওতায় আনা; বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি; নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো; জ্বালানি অপচয় কমানো এবং দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা ও এলএনজি আমদানিকে সহায়ক উৎস হিসেবে ব্যবহার করা।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ আগামী দিনে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চাইলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। অন্য দিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান এলএনজি নির্ভরতা, অন্য দিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের অপার সম্ভাবনা। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হতে পারে না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং আমদানি-নির্ভর নীতির সাথে একটি কার্যকর অনুসন্ধান কৌশলের সমন্বয় ঘটাতে হবে। জ্বালানি খাতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি ব্যয়বহুল আমদানির পথে আরো এগোবে নাকি নিজস্ব সম্পদের সন্ধানে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথরেখা।