রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ার পর ২টা থেকে ৩টা নাগাদ হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে যায়? কিংবা নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটলে এই উদ্বেগে ভোগেন যে প্রয়োজনমতো ঘুম হচ্ছে না?

কারো কারো মতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে এমনটা হতে পারে। আবার কারো ক্ষেত্রে এটা একটা গুরুতর সমস্যা। তবে এটা ঠিক যে হঠাৎ ঘুম কমে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।

ঘুম গভীর ও পর্যাপ্ত হওয়া এবং স্ট্রেসের পরিমাণ যতটা সম্ভব কম রাখা নয়া উদ্যমে পরের দিন শুরুর জন্যই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও এটা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরাও ভালো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রামের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ঘুম একটা নিরবিচ্ছিন্ন অবস্থা নয়। এর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে, যেমন লাইট স্লিপ বা পাতলা ঘুম, অর্থাৎ যে অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকলেও আমরা সতর্ক থাকি।

তাছাড়া রয়েছে- গভীর ঘুম এবং স্বপ্ন (র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা আরইএম স্লিপ) দেখার পর্যায়।

এ চক্রটি প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর পরিবর্তিত হয়। আরইএম পর্যায় বলতে বোঝায় ‘র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ’। অর্থাৎ যে সময় চোখের তারার ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ের সাথে আমাদের স্বপ্ন দেখার সম্পর্ক রয়েছে। স্মৃতির প্রক্রিয়াকরণ ও একত্রিত করার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

সাধারণত, রাতের প্রথম দিকে গভীর ঘুম হয়, আর ভোরের দিকে ঘুমের মাঝেও আমরা সতর্ক অবস্থায় থাকি। ২টা থেকে ৩টা নাগাদ মূলত হাল্কা ঘুম হয় এবং ছোটখাটো কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

অনেক সময় মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রায় বদল কিংবা স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে ঘুম কমে যেতে পারে। অনেক সময় একবার ঘুম ভেঙে গেলে তারপর ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

এর কারণ কী, বিষয়টা কতটা উদ্বেগের এবং চিকিৎসকরা সে সম্পর্কে কী বলছেন জেনে নেয়া যাক।

২টা থেকে ৩টা নাগাদ ঘুম হারানোর কারণ
রাত ২টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে ঘুম হারানোর নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি।

সার্কাডিয়ান ছন্দ বলতে শরীরের এমন এক প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে বোঝায়, যা ২৪ ঘণ্টায় আমাদের ঘুম ও সজাগ থাকার চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ভোরের দিক থেকে আমাদের শরীর ধীরে ধীরে পরের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। কর্টিসল নামক যে হরমোন রয়েছে, সেটা আমাদের জেগে উঠতে সাহায্য করে।

অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্টিসল এক প্রকার অত্যাবশ্যকীয় স্টেরয়েড হরমোন যা আমাদের মানসিক চাপ-সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া, বিপাক, রক্তচাপ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। এটা শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ মেনে চলে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কর্টিসলের মাত্রা এত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় যে আমরা সেটা বুঝতে পারি না।

কিন্তু যদি আপনি ক্রমাগত মানসিক চাপের সম্মুখীন হন, উদ্বিগ্ন থাকেন বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে হতে পারে যে আপনার শরীরে কর্টিসলের মাত্রা ইতোমধ্যে বেশি।

কর্টিসলের মাত্রা বাড়লে সতর্ক হওয়ার জন্য মস্তিষ্কে একটা সঙ্কেত যায় যা ঘুমকে ব্যাহত করে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে ওঠাটাই কিন্তু একমাত্র সমস্যা নয়। একবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে না পারাটাও সমস্যার।

এর নেপথ্যে ক্রমাগত দুশ্চিন্তা, কাজ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া বা ‘ঘুম না পাওয়া’ সম্পর্কে উদ্বেগের মতো বিষয়গুলো কাজ করতে পারে।

মুম্বাই লাগোয়া পানভেলের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: ঋষভ ভার্মার বলেন, ‘এটা আপনার শরীরের জৈবিক ঘড়ির ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি সাধারণত রাত ১০ থেকে ১১টায় ঘুমাতে যান, তবে ভোর ৩টা আপনার শরীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ ততক্ষণে ঘুমের বেশিভাগটাই সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাত ২টা থেকে ৩টা নাগাদ আপনার শরীর ধীরে ধীরে পরের দিনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। দেহের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন স্তরে চলে যায়, ঘুম পাতলা হয়ে আসে এবং একইসাথে শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ধীরে ধীরে আবার সক্রিয় হতে থাকে। তাই সেই সময় আপনার পাশে শুয়ে থাকা ব্যক্তির একটু নড়াচড়া বা সামান্য শব্দ কিংবা আপনার মাথায় যে চিন্তা চলছে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।’

ঘুমে এরকম ব্যাঘাত স্বাভাবিক কি-না, এই প্রশ্নের জবাবে ডা: ভার্মা বলেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক। লাখ লাখ বছর আগে, রাতে কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকা আমাদের পূর্বপুরুষদের আশপাশের বিপদ সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করত। ঘুম নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি রাতে দুই থেকে চারবার জাগেন।’

জেগে থাকার এই চক্র সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের হয় এবং তারপর আবার আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে এটা মনে পড়ে না। কিন্তু যখন রাতে আমরা সম্পূর্ণ সজাগ থাকি, মস্তিষ্ক কাজ করে তখন আবার ঘুমিয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকেই।

সার্কাডিয়ান ছন্দ ও ঘুমের চক্র
মস্তিষ্কের সুপ্রাকিয়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামক অংশ সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। এটা আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত একটা ক্ষুদ্র অংশ। শরীরের এই অংশটা দিন-রাত চক্রের সাথে আমাদের বিভিন্ন কার্যকলাপের একটা সমন্বয় তৈরি করে।

ভোরের দিকে আমাদের শরীর ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। সেই সময় কর্টিসলের মাত্রা কম থাকলেও ঘুম থেকে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে তা বাড়তে থাকে।

এই সময় গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যায় এবং আরইএম স্লিপ বেড়ে যায়। আরইএম স্লিপ মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে। তাই এই পর্যায়ে জেগে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ঘুমের চক্র এবং জেগে ওঠার সাথে এর সম্পর্কের বিষয়ে ডা: ভার্মা বলেছেন, ‘আমাদের ঘুমের চক্র রয়েছে এবং প্রতিটা চক্র প্রায় ৯০ মিনিট দীর্ঘ। তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘুমের প্রকৃতি বদলায়।’

রাতের প্রথমার্ধে অর্থাৎ রাত ২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সাধারণত পাতলা ঘুম হয় এবং আরইএম স্লিপ দেখা যায়। ভোর ৩টার কাছাকাছি সময়টা হালকা ঘুম হয় বা আমরা স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখার কারণে মস্তিষ্ক ইতোমধ্যে বেশ সক্রিয় থাকে। তাই সামান্যতম ব্যাঘাতও ঘুম কাড়তে পারে।

রাতে ঘুমানোর ক্ষেত্রে হরমোন ও মস্তিষ্কের ভূমিকা কী?
কর্টিসলের পাশাপাশি অন্যান্য হরমোনগুলোর ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে আমরা মুম্বাইয়ের ওখার্ড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডা: প্রশান্ত মাখিজার কাছে জানতে চেয়েছিলাম।

কর্টিসল ছাড়া অন্য কোনো হরমোন এর জন্য দায়ী জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ‘ঘুম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটা হরমোনের সম্মিলিত প্রভাব দেখা যায়। মেলাটোনিন, যা ঘুমের হরমোন হিসেবে পরিচিত, সেটা রাতের দিকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নিঃসরণ হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা ধীরে ধীরে কমে। মেলাটোনিনের মাত্রা কমলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

অন্যান্য হরমোনের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘কর্টিসল একটা হরমোন যা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। ঘুম থেকে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে এর মাত্রা বেড়ে যায় এবং সেটা শরীরকে সজাগ রাখতে সাহায্য করে। অ্যাড্রেনালিন ও নোরড্রেনালিন হরমোন তীব্র সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, প্যানিক ডিসঅর্ডার বা হঠাৎ জেগে ওঠার জন্য দায়ী হতে পারে।’

এছাড়া গ্রোথ হরমোন, ইনসুলিন ও প্রজনন হরমোনগুলোও ঘুমের গুণমানের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।

ভোর ৩টায় ঘুম ভাঙার পর চিন্তা আসে কেন?
এই প্রশ্নের জবাবে ডা: প্রশান্ত মাখিজা বলেছেন, এর পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণ রয়েছে।

রাতের বেলা আমাদের আশপাশে কোলাহল কম, মন বিভ্রান্ত হওয়ার উপাদানও কম থাকে। তাই হঠাৎ ঘুম পাতলা হয়ে এলে আমাদের মস্তিষ্ক অসমাপ্ত কাজ, আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ বা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে শুরু করে।

ডা: মাখিজা বলেন, ‘আরইএম স্লিপের সময় আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশটা সংবেদনশীল বিষয়গুলোর সাথে থাকে, সেটা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তুলনামূলকভাবে যুক্তি এবং সমস্যা সমাধানের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ কম সক্রিয় থাকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই কারণে উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো দিনের চেয়ে রাতে আরো বেশি গুরুতর বলে মনে হতে পারে। উদ্বেগজনিত ব্যাধি, ডিপ্রেশন, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস ও বার্নআউটের সাথে যুঝছেন, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এরকম হওয়াটা স্বাভাবিক।’

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আবার না ঘুমোতে পারার বিষয়টা ব্যক্তি বিশেষে আলাদা। এই প্রসঙ্গে ডা: মাখিজা জানিয়েছেন, এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ যেমন তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ আবার এই অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকেন।

তিনি বলেন, ‘এটা মূলত আমাদের মানসিক ও শারীরিক উদ্দীপনার স্তরের ওপর নির্ভর করে। যারা ঘুম ভাঙার পর শান্ত থাকেন, তারা সহজেই আবার ঘুমিয়ে পড়তে সক্ষম হন। তবে যারা ভাবেন- আমাকে ঘুমাতে হবে বা আগামীকাল হয়ত খারাপ কাটতে পারে, তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পুনরায় ঘুম আসতে তাদের সময় লাগে।’

ডা: মাখিজা আরো বলেন, ‘উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, থাইরয়েড, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা বা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেও কেউ কেউ পুরো রাত জেগে থাকেন।’

রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম এক জাতীয় স্নায়ুজনিত সমস্যা যেখানে পায়ে অস্বস্তি বা যন্ত্রণা অনুভব হতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমাগত পা ক্রমশ নাড়ান।

এ ক্ষেত্রে বয়স ও ঘুমের অভ্যাস কতটা প্রভাব ফেলে জানতে চাওয়ায় ওই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘হ্যাঁ, এরা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাতলা ঘুমের পর্যায় আরো বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বয়স্ক ব্যক্তিদের রাতে ঘুম থেকে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে।’

ডা: মাখিজা বলেন, ‘কারো কারো অভ্যাস তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া। আবার অনেকের দেরি করে ওঠার অভ্যাস। তাদের দেহের প্রাকৃতিক জৈবিক ঘড়ির ওপর নির্ভর করে ঘুম এবং জেগে থাকার সময় পরিবর্তিত হতে পারে। অনিয়মিত কাজের সময়, শিফট ডিউটি বা অবিচ্ছিন্ন ভ্রমণ আমাদের সার্কাডিয়ান ছন্দের ব্যাঘাত ঘটাতে এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।’

যে সময় আমরা খাবার খাচ্ছি তা ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে কি-না জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছেন, ‘ঘুমের সাথে এর কিছু সম্পর্ক রয়েছে। তাড়াতাড়ি খাবার খেলে মাঝরাতে খিদে পেতে পারে এবং রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যাওয়ায় ঘুমও ভাঙতে পারে।’

ডা: মাখিজা আরো বলেন, ‘ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভারী খাবার খেলে বদহজম, অ্যাসিডিটি, পেটে ফাঁপাভাব বা অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। অত্যাধিক অ্যালকোহল সেবন করলে রাতের প্রথম দিকে ঘুম হলেও পরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া বিকেল বা সন্ধ্যায় অতিরিক্ত ক্যাফিন খাওয়াও ঘুমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।’

হাইড্রেশন ও শরীরের তাপমাত্রা এই ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ডা: মাখিজা বলেছেন, ‘শরীরে পানির অভাব হলে ড্রাই মাউথ (মুখের ভেতর শুষ্ক অনুভব করা) হতে পারে। তৃষ্ণা, মাথা ব্যথা বা অস্থিরতাও অনুভূত হতে পারে। ঘুমের সময় স্বাভাবিকভাবেই শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। ঘর খুব গরম, আর্দ্র বা পরিবেশ অস্বস্তিকর হলেও ঘুম ব্যাহত হতে পারে। শব্দ হওয়া, আরামদায়ক গদি না হওয়া বা ঘরে ভালোভাবে বায়ু চলাচল না করলেও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একজন চিকিৎসকের পক্ষেই স্বাভাবিক ঘুম আর অনিদ্রার মধ্যে পার্থক্য বোঝা সম্ভব। রাতে কিছু সময় ঘুম ভাঙা স্বাভাবিক এবং তাতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে যদি কোনো ব্যক্তি টানা জেগে থাকেন বা আবার ঘুমিয়ে পড়তে সমস্যা হয়, তাহলে তাকে মেইন্টেনেন্স ইনসোমিয়া বলে।’

স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
ডা: ঋষভ ভার্মার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে স্ক্রিন টাইম, দেরি করে খাওয়া এবং অ্যালকোহল পান ঘুমের ধরণ বদলাতে পারে কি-না।

তিনি জানিয়েছেন যে এ তিনটি বিষয়ই ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে।

কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ভোর ৩টায় ঘুম ভাঙার একটা বড় কারণ অ্যালকোহল হতে পারে। অ্যালকোহল পান করলে প্রাথমিকভাবে ঘুম পেতে পারে, কিন্তু পরের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে যখন যকৃৎ সেটাকে বিপাক করে, তখন তা উত্তেজক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। এটা আপনার ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, বিশেষত যখন ভোরের দিকে লাইট স্লিপ সাইকেল চলে।’

বেশি রাতে খাওয়া বা ঘুমানোর আগে ভারী খাবার বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খেলে তা হজম করার জন্য শরীরকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া উচ্চ মাত্রায় চিনি আছে এমন খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তার কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ সেই মাত্রা কমে যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা কম থাকলে শরীরকে স্থিতিশীল রাখতে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়।

অন্যদিকে, গভীর রাতে ফোন বা ট্যাব ব্যবহার করলে চোখের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ফোনের স্ক্রিন থেকে নীল আলো বের হয়। ফলে মস্তিষ্ক ভাবতে থাকে এটা দিন এবং ঘুমের সাথে সম্পর্কিত যে প্রাকৃতিক সঙ্কেত রয়েছে সেখানেও এর প্রভাব পড়ে। সব মিলিয়ে ঘুমে বিঘ্ন ঘটে।

ভালো ঘুমের জন্য কী করতে পারি?
রাতে মস্তিষ্ক ক্রমাগত জেগে না থেকে যাতে ঘুমিয়ে পড়ে তার জন্য আমরা মগজকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি। এক্ষেত্রে সন্ধ্যা থেকে প্রস্তুতি নেয়া, নিজেকে শান্ত করা এবং মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা দরকার। এক্ষেত্রে আমরা যা করতে পারি-

১. ঘুমাতে যাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল ও টিভি ইত্যাদির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে হবে।

২. ঘুমানোর কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটার বন্ধ করে দিতে পারি। তার পরিবর্তে খুব বেশি আলো নেই এমন ঘরে গিয়ে আমরা বই পড়তে বা মন ছুঁয়ে যায় এমন গান শুনতে পারি। এতে আমাদের মস্তিষ্কে এই সঙ্কেত যাবে যে দিন শেষ হয়ে গিয়েছে।

৩. ঘুমানোর তিন ঘণ্টা আগে কী খাচ্ছি, সেদিকে মনোযোগ দেয়াও দরকার।

৪. ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করা এবং গভীর রাতে ভারী বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। খিদে পেলে রক্তে শর্করাকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে এমন খাবার যেমন-প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া দরকার। যদি রাত ২টা থেকে ৩টার সময় ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে ২০ মিনিটের এই নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে।

৫. সেই সময় ফোন ঘাঁটা চলবে না। কারণ যখনই দেখবেন যে ভোর সাড়ে ৩টা বা সোয়া ৩টা বাজে, তখনই মগজ হিসেব করবে আর কত ঘণ্টা ঘুম বাকি। এটা স্ট্রেস বাড়িয়ে তোলে। ওই সময় ঘুম ভাঙার পর যদি ২০ মিনিটের মতো বিছানায় শুয়েও ঘুম না আসে- তাহলে উঠে বসা এবং নিজেকে ধীরে ধীরে শান্ত করা দরকার।

৬. অন্য ঘরে গিয়ে বা আবছা আলোতে আরামদায়ক চেয়ারে বসা যেতে পারে, যাতে মনে শান্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্য আসে। একটা সহজ কিছু যেমন ম্যাগাজিন পড়া বা ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলার ব্যায়াম করা যায়। চোখের পাতা ভারী না হওয়া পর্যন্ত বিছানায় ফিরে যাওয়া চলবে না। এটা মনকে জানান দেবে যে, বিছানাটা আসলে আরামে ঘুমের জন্য, চিন্তা করার জন্য নয়।

৭. জীবনযাত্রায় বড়-সড় পরিবর্তন আনতে, ডায়েট পরিবর্তন করতে, ওষুধ খেতে বা ব্যায়াম করতে হলে চিকিৎসক বা যোগ্য প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেয়া দরকার।

৮. প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে। যে লক্ষণ চোখে পড়েছে সে বিষয়ে ডাক্তারকে জানানো দরকার এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাত্রায় বদল আনতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে ওষুধ খেলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সূত্র: বিবিসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews