ব্যথা আছে বলেই আমরা বুঝতে পারি আমাদের শরীরে কোনো সমস্যা আছে কি না। ব্যথা যত যন্ত্রণাদায়ক হোক না কেন আসলে তা মহান সৃষ্টিকর্তার এক নেয়ামত। কারণ ব্যথা অনুভব না হলে আমরা বুঝতেই পারতাম না যে, আমাদের শরীরে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। ব্যথা হলে তখনই আমরা ব্যথার কারণ জানার চেষ্টা করি এবং চিকিৎসা গ্রহণ করি। একটি নির্দিষ্ট নিয়মে এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ব্যথানাশক ঔষধ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করলে সাধারণত সমস্যা হয় না। কিন্তু যাদের কিডনির কার্যকারিতা কম তাদের এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ব্যথানাশক ঔষধ সেবন নিষিদ্ধ। যাদের কিডনির রোগ, হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, লিভারের রোগ, ডাইয়্যুরেটিকস্ জাতীয় ঔষধ সেবনকারী রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ এবং তত্ত্বাবধান ছাড়া এ ধরনের ঔষধ সেবন করা মোটেই ঠিক না।
কিডনি রোগীরা ব্যথার জন্য ট্রামাডল জাতীয় ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করতে পারেন। ট্রামাডল ব্যথানাশক ঔষধ মাঝারি ধরনের ব্যথা নিরাময় করে থাকে। ট্রামাডল ব্যথানাশক ঔষধ সেবনের ক্ষেত্রেও ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। ট্রামাডল জাতীয় ঔষধের সাথে অনডানসেট্টন জাতীয় ঔষধ সেবন করা যাবে না। এতে ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন হয়ে থাকে। আর এজন্য ট্রামাডল জাতীয় ঔষধের কার্যকারিতা কমে যায়। যাদের হার্টের রোগ আছে কিন্তু কিডনির সমস্যা নাই তাদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বল্প মাত্রায় এসপিরিন খেতে সমস্যা নাই। কিন্তু যাদের কিডনি রোগ আছে অথবা কিডনির কার্যকারিতা অনেক কমে গেছে তাদের ক্ষেত্রে এসপিরিন খেতে সমস্যা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ডাক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। যাদের অনেক বেশি এসিডিটি রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ প্রয়োজন হতে পারে। আর এসপিরিন এর মাত্রা বেশি হলে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়ে নেওয়া ভালো।
ব্যথা হলে ব্যথানাশক ঔষধ খেতে হতে পারে। কিডনির কার্যকারিতা কম থাকলে খুব প্রয়োজন না হলে ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করা ঠিক নয়। এসব ঔষধ কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আপনি যদি লম্বা সময় ধরে ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করেন তাহলে সুস্থ স্বাভাবিক কিডনিও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে। এর অর্থ হলো আপনি কিডনি রোগী ছিলেন না। কিন্তু ব্যথার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিয়মনীতি না মেনে যখন তখন দীর্ঘ সময় ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করেছেন যার কারণে আপনার কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আপনি ধীরে ধীরে কিডনি রোগীতে পরিণত হয়েছেন। অনেক সময় শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকের কারণে আপনার কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। তাই এ ধরণের ঔষধ সেবনকালে আপনার রক্তের ক্রিয়েটিনিন এর পরিমান অবশ্যই দেখে নিতে হবে। কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে মিশ্র ব্যথানাশক ঔষধ যেমন আইবুপ্রোফেন, ক্যাফেইন এবং অ্যাসিটামিনোফেন এড়িয়ে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ এ জাতীয় ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়া ঠিক নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যথার ঔষধের সাথে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ সেবন করা হয়। কিন্তু লম্বা সময় ধরে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ হিসাবে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করলে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যারা এলকোহল সেবন করেন অর্থাৎ নিয়মিত মদ্যপান করে থাকেন তারা ব্যথানাশক ঔষধ এনএসএআইডি সেবন করলে পাকস্থলি থেকে রক্তপাত হতে পারে। তাই এলকোহল সেবনের পর ব্যথার ঔষধ সেবনের ক্ষেত্রে ডাক্তারের বিশেষ পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
সিরোসিস সহ লিভারের রোগীদের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ব্যথার ঔষধ বেশি নিরাপদ বা পছন্দ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে প্যারাসিটামল এর একটি মাত্রা নির্ধারণ করা থাকে। ক্রনিক লিভার ডিজিজের ক্ষেত্রে মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার লিভারের রোগে এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করা ঠিক নয়। স্বল্পমাত্রার লিভার ডিজিজের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল এবং এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ঔষধ সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি স্বল্পমাত্রার লিভারের রোগ থাকে তাহলে এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ঔষধ যেমন ইটোরিকক্সিব দৈনিক ৬০ মিলিগ্রামের বেশি দেওয়া ঠিক নয়। মাঝারি মাত্রার লিভারের রোগে ইটোরিকক্সিব দৈনিক ৩০ মিলিগ্রাম দেওয়া যেতে পারে। লিভারের রোগে প্যারাসিটামল এবং ট্রামাডলের কম্বিনেশন দেওয়া যেতে পারে। এ ধরণের কম্বিনেশন ঔষধ অতিরিক্ত ব্যথানাশক হিসাবে কাজ করে থাকে। লিভারের রোগীর যদি জন্ডিস থাকে আর সাথে জ¦র থাকে তাহলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট না দিয়ে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হবে। লোকাল অ্যানেসথেশিয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।
মাঝারি মাত্রার লিভারের রোগে নালবিউফিন ব্যথানাশক ঔষধ ব্যবহার করা যায়। এটি একটি অপিয়ড এনালজেসিক। নালবিউফিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন রুপেও পাওয়া যায়। ফলে জরুরী প্রয়োজনে লিভারের রোগীকে ব্যথার জন্য ইনজেকশন হিসাবে নালবিউফিন প্রদান করা যায়। তবে এক্ষেত্রে রোগীর সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আনতে হবে।
কিডনি এবং লিভারের রোগীদের ব্যথানাশক ঔষধ প্রদানের পূর্বে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইলেকট্রোলাইটস্, এসজিপিটি, ইএসআর, সিবিসি দেখে নেওয়া ভালো। ব্যথানাশক ঔষধ সব সময় একটি নিয়মনীতি পালন করে সেবন করতে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায়ও ব্যথার ঔষধ সেবন করতে হলে রোগীর ওজন, উচ্চতা এবং সার্বিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আনতে হবে। ঔষধের দোকান থেকে ব্যথার মুখস্ত ঔষধ কিনে খাবেন না।
ডা. মোঃ ফারুক হোসেন
ইমপ্রেস ওরাল কেয়ার
বর্ণমালা সড়ক, ইব্রাহিমপুর, ঢাকা।
মোবাইল ঃ ০১৮১৭৫২১৮৯৭
ই-মেইল ঃ [email protected]