স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরটি শুধু রাস্তা, ভবন আর স্টেডিয়ামের সমন্বয়ে গড়ে ওঠেনি। এই শহরের আছে শত বছরের গল্প। কোনো পুরোনো ভবনের দেয়ালে লুকিয়ে আছে অতীত, কোনো নদীর স্রোত বয়ে আনে সভ্যতার স্মৃতি, কোনো গলির ভেতর শোনা যায় মানুষের সংগ্রাম আর স্বপ্নের গল্প।

২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসের সময় বিশ্বের চোখ থাকবে এই শহরের চারটি ভেন্যুর দিকে। একসময় বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্পকেন্দ্র ও জাহাজ নির্মাণের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গ্লাসগো আজ সময়ের পরিবর্তনে শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রীড়ার আধুনিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।

গ্লাসগোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্লাইড নদী। ১৮ ও ১৯ শতকে এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ক্লাইডের তীরে তৈরি জাহাজ পাড়ি দিয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বাণিজ্য, প্রকৌশল আর শ্রমিকদের দক্ষতায় গ্লাসগো হয়ে উঠেছিল ব্রিটেনের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী শহর।

একসময় শিপইয়ার্ডের শব্দে মুখর থাকা ক্লাইড নদীর তীর শুধু শিল্পের কেন্দ্র ছিল না, তৈরি করেছিল শ্রমিক আন্দোলন, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের এক বিশেষ ইতিহাস।

সময় বদলেছে। শিল্পের অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। গ্লাসগো থেমে থাকেনি। পুরোনো শিল্পের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন গ্লাসগো তৈরি হয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, সংগীত, থিয়েটার, সৃজনশীল শিল্প ও পর্যটন এখন শহরের নতুন শক্তি।

শহরের সংস্কৃতির প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায় কেলভিনগ্রোভ আর্ট গ্যালারি, জাদুঘর, ছোট ছোট ক্যাফে, স্থানীয় বাজার আর রাস্তার শিল্পে। গ্লাসগোর দেয়ালও যেন কথা বলছে। বিভিন্ন স্থানে আঁকা মুরালে উঠে এসেছে ডানকান স্কট, জশ কের, আইলিশ ম্যাককলগানদের মুখ। এগুলো শুধু ছবি নয়, নিজেদের নায়কদের প্রতি একটি শহরের ভালোবাসার প্রকাশ।

কমনওয়েলথের আবেগ শুরু হবে টলক্রস ইন্টারন্যাশনাল সুইমিং সেন্টার থেকে। এই সুইমিং পুল স্কটিশ ক্রীড়ার আবেগের ঠিকানা। ২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে এখানেই ১৭ বছর বয়সী ডানকান স্কট প্রথমবার নিজেকে চিনিয়েছিলেন।

সেই তরুণ আজ অলিম্পিক পদকজয়ী কিংবদন্তি। তাই গ্লাসগো তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বিশেষ সম্মান। টলক্রসের একটি স্ট্যান্ডের নাম এখন ‘দ্য স্কট স্ট্যান্ড’। যে জায়গা থেকে তার স্বপ্নের শুরু, সেই জায়গাই এখন তার সাফল্যের স্মারক।

পানির নীল জগতের বাইরে টলক্রসের আশপাশের জীবনও বদলে যাবে গেমসের সময়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন বিশ্বের নানা দেশের অ্যাথলেট, কোচ ও দর্শকরা। একই রাস্তায় হাঁটবেন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন আর সাধারণ মানুষ।

অ্যাথলেটিকসের ঠিকানা স্কটসটাউন স্টেডিয়াম। নতুন ট্র্যাক, কাছ থেকে অ্যাথলেটদের দেখার সুযোগ এবং গ্যালারির উন্মাদনা এই ভেন্যুকে করে তুলেছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। এখানেই দৌড়াবেন বিশ্বরেকর্ডধারী জশ কের, আইলিশ ম্যাককলগান, লরা মুইরদের মতো স্কটিশ তারকারা। নিজেদের শহরে প্রিয় অ্যাথলেটদের সামনে দেখতে পাওয়ার সুযোগ স্টেডিয়ামকে পরিণত করবে আবেগের মঞ্চে।

স্যার ক্রিস হয় ভেলোড্রোম ও এরিনা হবে ট্র্যাক সাইক্লিং, প্যারা ট্র্যাক সাইক্লিং ও শৈল্পিক জিমন্যাস্টিকসের মঞ্চ। স্কটিশ ইভেন্ট ক্যাম্পাস হবে একাধিক ক্রীড়ার কেন্দ্র। এখানে অনুষ্ঠিত হবে নেটবল, বক্সিং, বোলস, প্যারা বোলস, জুডো, তিন-জনের বাস্কেটবল, হুইলচেয়ার তিন-জনের বাস্কেটবল, ভারোত্তোলন ও প্যারা পাওয়ারলিফটিং।

স্কটিশ ইভেন্ট ক্যাম্পাসের ওভিও হাইড্রোতে অনুষ্ঠিত হবে নেটবল এবং গ্লাসগো গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এসইসি সেন্টারে হবে বক্সিং, বোলস, প্যারা বোলস, জুডো, তিন-জনের বাস্কেটবল ও হুইলচেয়ার তিন-জনের বাস্কেটবল। এসইসি আর্মাডিলো হবে ভারোত্তোলন ও প্যারা পাওয়ারলিফটিংয়ের মঞ্চ।

গ্লাসগোর সৌন্দর্যের আরেকটি বড় অংশ রিভার ক্লাইড। একসময় যে নদী ছিল শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাণ, আজ সেটিই শহরের পুনর্জাগরণের প্রতীক। নদীর পাশে আধুনিক স্থাপনা, পুরোনো ভবন আর মানুষের ব্যস্ততা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য শহুরে পরিবেশ।

জর্জ স্কয়ারে দাঁড়ালে বোঝা যায় গ্লাসগো কতটা ইতিহাস বহন করে। রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের অধিকার আদায়ের বহু ঘটনার সাক্ষী এই স্থান। এই শহরের মানুষ শুধু ক্রীড়াপ্রেমী নয়, তারা নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও গর্বিত।

বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্র, রাস্তাঘাট থেকে ক্যাফে, নদীর তীর থেকে স্থানীয় বাজারে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।

চারটি ভেন্যু, গল্প হাজারো। কোথাও পানির গতি। কোথাও ট্র্যাকের ঝড়। কোথাও শক্তির পরীক্ষা। কোথাও নিখুঁত দক্ষতার লড়াই। সব গল্পের কেন্দ্রে গ্লাসগোর মানুষ।

২০১৪ সালে এই শহর ক্রীড়া আয়োজনকে মানুষের উৎসবে পরিণত করেছিল। আবার সেই সুযোগ এসেছে। সময় কম, প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ বড়। তবে গ্লাসগোর সবচেয়ে বড় শক্তি তার নাগরিকরা।

২৩ জুলাই ৭৪টি দেশের পতাকা শহরের আকাশে উড়বে। শুধু চারটি ভেন্যু নয়, পুরো গ্লাসগোই হয়ে উঠবে একটি জীবন্ত স্টেডিয়াম। শহরের প্রতিটি রাস্তায় থাকবে গল্প, প্রতিটি দেয়ালে থাকবে স্মৃতি, প্রতিটি মানুষের চোখে থাকবে গর্ব।

শিল্পের শহর। নদীর শহর। সংগ্রামের শহর। সংস্কৃতির শহর। এবার কমনওয়েলথের শহর।

গ্লাসগোর দেয়াল কথা বলে, নদী গল্প শোনায়, স্টেডিয়ামগুলো অপেক্ষা করছে নতুন ইতিহাসের জন্য।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews