যারা রাজনীতি করেন বা জনপ্রতিনিধি, তারা স্বভাবতই সাধারণের চেয়ে এগিয়ে থাকেন। তারা জনগণের পাল্স বোঝেন। কীভাবে ভোট পেতে হয় সে কৌশলও জানেন। ক্ষমতাসীন হলে কীভাবে কাজ করতে হয় তা-ও জানেন। আবার জনগণের ওপর কীভাবে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসতে হয় সেটাও জানেন। এ উপক্রমণিকা সাধারণ বিচারে। নতুন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এখন পর্যন্ত সবকিছুই ইতিবাচক। তার পরও জনগণের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলতে চাই। কথাগুলো সরকার যদি গ্রহণ করে, জনগণ উপকৃত হবে। আর জনগণ উপকৃত হলেই সরকার সফল। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথাগুলো কীভাবে কতটা গ্রহণ করবেন, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথমত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিতে চাই এজন্য যে তিনি তাঁর নির্বাচনি ইশতেহার সামনে রেখে এগোচ্ছেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের পাইলট প্রজেক্ট শুরু করেছেন। দ্বিতীয়ত জনপ্রশাসন ও সামরিক প্রশাসন ঢেলে সাজাচ্ছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক ঠিক করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সর্বোপরি বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ সামনে রেখে পথচলার চেষ্টা করছেন। নিজের গাড়িতে চড়ছেন। সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে পথ চলছেন। সাত দিনের সরকারের এসব কাজ জনগণের কাছে আপাতত সমাদৃত হচ্ছে। আরও কিছু কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ‘প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে গেলে অতি জরুরি, জরুরি, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে।
বহুদিন পর জনগণ গণতন্ত্রের স্বাদ পাচ্ছে। নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরে সবাই খুশি। বিশেষ করে নতুন ও নারী ভোটাররা আনন্দিত। এখন লক্ষ রাখতে হবে, তাদের এ আনন্দ যেন নিরানন্দে পরিণত না হয়। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজের দলের নেতা-কর্মীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। দলের কোনো নেতা-কর্মী, যে পর্যায়েরই হোন না কেন, কেউ যেন চাঁদাবাজি, দখল, লুটপাট, টেন্ডারবাজি করতে না পারেন। দলের সব নেতা-কর্মী দখলবাজ, চাঁদাবাজ নন। ওয়ার্ড থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপি পর্যন্ত হাতেগোনা কিছু লোকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আছে। কিন্তু নতুন বন্দোবস্ত ও নতুন সরকারের অধীনে দলের কোনো নেতা-কর্মী যদি কোনো ধরনের অপকর্মে জড়ান, তাহলে শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই দায় এড়ানো যাবে না। বরং তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হবে। তারা আশ্বস্ত হবে। কারণ জনগণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে যে এখন দলের ভিতরে অনেক ধরনের লোকের সমাগম হবে। ভালোমন্দ, লুটেরা, চোর, বাটপাড় সব ধরনের মানুষই ক্ষমতাসীন দলে থাকে। ভিড়তে উন্মুখ হয়ে থাকে। অসৎ মানুষ দ্রুত ভোল পাল্টে, রাজনৈতিক মুখোশ পাল্টে ক্ষমতাসীন দলে ঢুকে পড়ে। হয়তো অনেকে বলার চেষ্টা করবে যে আওয়ামী লীগের বা বৈষম্যবিরোধীদের অনেকে বিএনপির নামে চাঁদাবাজি করছে। যে যা-ই বলুক, চাঁদাবাজ যে দলেরই হোক, সে চাঁদাবাজ। সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজের কোনো দল নেই। এদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটা অতি জরুরি ও বড় কাজ হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করবে।
এ ছাড়া এখন অনেকেই হঠাৎ নেতা বা ক্ষমতাবান হয়ে যাবে। কেউ নেতা বা ক্ষমতাবান হবে লন্ডন কানেকশনে, কেউ হবে বাংলাদেশ কানেকশনে। যে কানেকশনেই হোক না কেন, তা যেন দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণ না হয়। ক্ষমতার দাপটে যেন সূর্যের চেয়ে বালির তাপ বেশি না হয়। লন্ডন কানেকশনের নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন তারেক রহমানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে না পারে। যারা প্রধানমন্ত্রী বা ব্যক্তি তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করবে, তাদের কোনো গৌরবের পরিচয় নেই। অনেকের হয়তো ঠিকঠাক বংশপরিচয়ও নেই। কিন্তু তারেক রহমানের ঈর্ষণীয় মহিমান্বিত মর্যাদার, সোনার অক্ষরে লেখা পরিচয় আছে। তিনি শুধু এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নন; তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। কোনো সুযোগসন্ধানীর অপকর্মের জন্য যেন বাবা-মা মানুষের গালি না খান, তারেক রহমানকে সেদিকে কঠোরভাবে লক্ষ রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ‘গুপ্তরা’ তো আছেই। এদের ব্যাপারেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোনো ভালোমানুষের মুখোশ পরে এরা যেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা ব্যক্তিগত স্টাফের বহরে ঢুকে না পড়ে, সেদিকেও তারেক রহমানকে সতর্ক থাকতে হবে।
গত ১৮টি মাস ছিল বন্ধ্যা সময়। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকে এজেন্ডায় রাখলেও অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল আরও অনেক ভিন্ন এজেন্ডা। সে কারণে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী ভাইবোনেরা রেমিট্যান্স না পাঠালে হয়তো রাষ্ট্রের নিত্যদিনের খরচ চালানোই ড. ইউনূস সরকারের জন্য কষ্টসাধ্য হতো। কোটামুক্ত চাকরির দাবিতে গণ অভ্যুত্থান হলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশের কোথাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বরং দেশি বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেক বড় ব্যবসায়ীকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। অর্থ পাচার বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করেছে। অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ১৮ মাস টিকে ছিলেন নতুন বন্দোবস্তের নামে, তরুণ তুর্কিদের চাঁদা দিয়ে। মব সৃষ্টির ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশের ব্যবসায়ী সমাজ একটা দমবন্ধ অবস্থায় ছিলেন। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় সংকট। অর্থনীতি সুস্থ না হলে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বা জাতীয় জীবনের কোথাও শান্তি আসবে না। বিগত সরকার বিনিয়োগ আনার জন্য বিস্তর ঢাকঢোল পিটিয়ে বিদেশিদের ডেকে একটি সম্মেলন করেছিল। কিন্তু কোনো সুফল অর্জিত হয়নি। কারণ বিদেশিরা অনির্বাচিত, খণ্ডকালীন কোনো সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। সেজন্য তারা বিনিয়োগ করার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্মেলন থেকে বিদায় নেয়। নতুন সরকারের প্রধান তারেক রহমানকে এখন অর্থনীতিতে গতি আনার কাজটি দ্রুত করতে হবে। এর জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারী নয়, দেশি শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বসা এবং একটি সম্মেলন করা জরুরি। দেশের বিনিয়োগকারীদের কী কী সমস্যা আছে, কীভাবে সেগুলোর সমাধান হবে, সমাধান হলে দেশ কীভাবে উপকৃত হবে সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত। দেশি শিল্পোদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা তৈরি হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারিত হবে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বেকারত্ব কমবে। বেকার জনগোষ্ঠী কর্মমুখী হলে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
ব্যাংকিং এবং পুঁজিবাজারও ঢেলে সাজাতে হবে। জনগণ যেন ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি আস্থাশীল হয়। এ খাতে যেন নতুন কোনো লুটেরা শ্রেণির জন্ম না হয়। জনগণের টাকা যেন কেউ লুট করে বিদেশে পাচার করতে না পারে সেজন্য বিশ্বস্ত ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সেক্টরের নেতৃত্বে আনতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে লুট এবং পাচার হওয়া টাকা ফেরানোরও। আমাদের পুঁজিবাজারের আকার নেহাত ছোট নয়। এ বাজারের ওপর অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভরশীল। অনেক অবসরপ্রাপ্ত মানুষ দীর্ঘদিনের জমানোর সঞ্চয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সৎভাবে জীবনযাপন করতে চান। অনেক উদ্যমী যুবক চাকরির পেছনে না ঘুরে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হতে চান। কিন্তু চিহ্নিত মাফিয়া চক্রের কারসাজির কারণে অতীতে একাধিকবার অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। একটি সম্ভাবনাময় পুঁজিবাজার এখন মৃতপ্রায়। কারসাজির অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা এবং গতিশীল করতে হলে এ দুটি সেক্টরকেও সুস্থ রাখতে হবে।
ইংরেজিতে দুটি বাক্য অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। একটি হলো ‘Chair makes a man.’ অর্থাৎ পদ বা ক্ষমতা মানুষকে তৈরি করে নেয়। আরেকটি বাক্য হলো ‘Man makes a chair..’ অর্থাৎ মানুষই নিজের যোগ্যতায় চেয়ার বা ক্ষমতা অর্জন করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রে দুটি বাক্যই প্রযোজ্য। তিনি কীভাবে তাঁর চেয়ার বা ক্ষমতা কাজে লাগাবেন বা তাঁকে চেয়ার বা ক্ষমতা কীভাবে তৈরি করবে সেটা তাঁর ওপরই নির্ভর করবে। দেশবাসী তাঁর মধ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে চায়। তাঁর প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। সময়ের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী আরও বেশি গতিশীল, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ হবেন বলে জনগণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেজন্যই কঠোরভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে হবে। অর্থনীতি সচল করতে দেশি ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে শিল্প খাতের অচলাবস্থা কাটাতে হবে। অপতথ্য বন্ধ করতে ‘বট’বাহিনীর তালিকা ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে জনকল্যাণমুখী করতে হলে যত কঠিন সিদ্ধান্ত তা প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই নিতে হবে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে দেশবাসী খুশি হবে। আর দেশের মালিক জনগণ খুশি থাকলেই তারেক রহমানের পক্ষে তাঁর প্ল্যান সহজে, স্বল্পসময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন