দেশের বড় বড় সমস্যা ও নির্বাচন নিয়ে আমরা যখন ব্যস্ত, সেই ফাঁকে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। গত ১৬ মাসে ৯ হাজারের বেশি ধর্ষণ মামলা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই হিসাব ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এটা শুধু মামলার সংখ্যা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে, ধর্ষকের দাপটে, রাজনৈতিক কারণে, এক ঘরে হওয়ার ভয়ে এবং সর্বোপরি বিচার পাবেন না মনে করে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না বা করেন না।

চলন্ত বাস, ট্রেন, মার্কেট, ঘরে ঢুকে, হাসপাতাল ও অন্যান্য জনসমাগমপূর্ণ স্থানে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। এমনকি মর্গেও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে নারীর মরদেহ। এটা খুব বীভৎস ঘটনা কিন্তু অসত্য নয়।

ধর্ষণ বেশি হয় সেই সমাজে যেখানে আইন দুর্বল, নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতা কম, সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, পুরুষত্বকে বিকৃতভাবে শেখানো হয় এবং সমাজ যেখানে নীরব ভূমিকা পালন করে। এটা কোনো এক শ্রেণির “খারাপ মানুষ”-এর নিজস্ব সমস্যা নয়, এটা সমাজের মানসিক কাঠামোর ব্যর্থতা।

ধর্ষণের শিকার একজন নারী একবার বলেছিলেন, এলাকার লোকজন এমনভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, মনে হয় তারা চোখ দিয়ে পুনরায় ধর্ষণ করছে। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরা নানাধরণের অবান্তর প্রশ্ন করে। এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে কোন কোন নারী জানতে চেয়েছেন ”ধর্ষণের সময় মেয়েটির অনুভূতি কেমন হয়েছিল?” কী ভয়াবহ অসুস্থ মানসিকতা আমাদের। সবাইকে মানতে হবে ’ধর্ষণ’ একটি ভয়াবহ অপরাধ। ধর্ষণের বিচার না পাওয়া এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে ধর্ষণকে জায়েজ করাটা আরও বড় অপরাধ। দুটি অপরাধই সমাজে দ্রুত বাড়ছে।

শিশু ও কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার বেশি হচ্ছে, প্রাপ্তবয়সী নারীর তুলনায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৭৪৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪০১। ৭৪৯ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ৩৭০ জনই ছিলেন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।

ধর্ষণের পাশাপাশি বেড়েছে গণধর্ষণ। ৭৪৯ জনের মধ্যে ১৮০ জনকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। গণধর্ষণের শিকার হওয়াদের তালিকায় ছয় বছরের শিশু আছে ৩ জন, বারো বছরের কমবয়সী ৯ জন। আঠারো বছরের নীচে শিশু আছে ৩৫ জন। ৩৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মনোবিজ্ঞান ’গণধর্ষণ’ কে কোনো একক ব্যক্তির “যৌন লালসা” হিসেবে দেখে না। একে ব্যাখ্যা করা হয় দলগত বিকৃতি, ক্ষমতার মানসিকতা, নৈতিক ভাঙন হিসেবে। গণধর্ষণ করার সময় মানুষের দায়বোধ কমে যায়, তার বিবেক দুর্বল হয়। অপরাধী ভাবে আমি একা না, সবাই করছে, এতে নৈতিক বাধা ভেঙে পড়ে। গণধর্ষণ মূলত ‘যৌনতা’র চেয়ে’বেশি ক্ষমতা দেখানো’র মানসিকতা। অপরাধীর কাছে গণধর্ষণের শিকার নারী “ভোগ” নয়, “দখল” হিসেবে বিবেচিত হয়।

গত ২/৩ বছর যাবৎ নারীবিদ্বেষী প্রচারণা বাড়ছেই। কারণে-অকারণে, যেখানে-সেখানে সুযোগ পেলেই নারীর প্রতি বিষোদগার করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার এর বিরুদ্ধে দৃঢ় কোন অবস্থান নেয় না। যদিও বলা হয় নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতি ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ মানা হবে কিন্তু আদতে তা হয় না। কর্তৃপক্ষ মনে করে নারীর প্রতি সহিংসতা হচ্ছে দ্বিতীয় সারির অপরাধ। ফলে চলছে নারী বিদ্বেষ, পাশাপাশি নারীকে পদদলিত করার জন্য বাড়ছে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা ও ধর্ষণ।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন বলেন, ধর্ষণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তখন বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, রিপোর্টিং বাড়ার কারণেই ধর্ষণের সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরা কাউকে মামলা না করতে চাপ দিই না। তবে কিছু মামলা পরে প্রচলিত ধর্ষণ হিসেবে প্রমাণিত হয় না। (সূত্র: নিউ এজ পত্রিকা)

ওনার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে ধর্ষণকে তারা সেভাবে আমলে নিচ্ছেন না বা নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযুক্তদের শনাক্ত, মামলা রেকর্ড ও গ্রেপ্তারই পুলিশের প্রধান কাজ। পাশাপাশি চেকপোস্ট বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বাংলাদেশে একটি গুরুতর সামাজিক, মানসিক ও মানবাধিকার সমস্যা। ধর্ষণের ঘটনা শুধু সংখ্যায় নয়, বরং ধরণ ও বিস্তৃতির দিক দিয়েও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এটি এমন একটি ভয়াবহ সহিংস অপরাধ, যা কেবল ভুক্তভোগীর শারীরিক ক্ষতিই নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মধ্যে ধর্ষণ সবচেয়ে আলোচিত ও ভীতিকর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত, যদিও ধর্ষণ ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন, অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা আরো কঠিন।

অপরাধীর শাস্তি না হলে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি হয়। যখন সমাজে দেখা যায় ধর্ষণের পরও অনেকেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে, তখন এটি অপরাধীদের কাছে “গ্রহণযোগ্য আচরণ” হয়ে ওঠে। সেখানে অপরাধীর মনে এক ভয়ংকর বিশ্বাস জন্মে “আমাদের কিছু হবে না”। এই বিশ্বাস ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো দলগত অপরাধকেই বেশি সাহস জোগায়।

ধর্ষণের শিকার মেয়ের পরিবার ও সমাজ ভিন্ন খাতে ঘটনাকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে প্রায়ই। যেকারণে বিভিন্ন সময়ে আইন সংশোধন ও কঠোর শাস্তির ঘোষণা এলেও বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা কমেনি। সংবাদমাধ্যমে সহিংসতার সব খবর প্রকাশিত হয় না। প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি। পাশাপাশি চলছে ভিক্টিম ব্লেইমিং, যে নারী বা কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, তাকেই নানাধরনের দোষে দুষ্ট করা হচ্ছে। সবচাইতে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির উদ্দেশ্যে সমাজ বলে,“ওই মেয়েরা এমনই”, ”কেউ ওদের জোর করেনি”,“মেয়েটিরই দোষ”ইত্যাদি।

এই সমাজের একটা বড় অংশ নারীকে মানুষ নয়, বস্তু মনে করে। ফলে নারীর অনুভূতি অস্বীকার করা সহজ হয়। নারীর ‘না’ বলার অধিকারকে অগ্রাহ্য করা হয়। মেরিটাল রেপের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে থাকে। যখন কাউকে মানুষ হিসেবে দেখা হয় না, তখন সহিংসতা সহজ হয়। এটি সমাজের মানসিক অসুস্থতার চরম বহিঃপ্রকাশ।

ধর্ষণের অনেক ঘটনার পর দেখা গেছে, ভিক্টিম নারীকেই মানুষ অভিযুক্ত করে, বুলি করে এবং মারধরও করে। এমনকি ওই নারী ও নারীর পরিবার নিয়ে এমন কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, যাতে মেয়েটির সম্মানহানি হয়। একজন ভিক্টিম নারীকে অপদস্থ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বিষয় ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেন ধর্ষণের শিকার একজন নারীকে নিয়ে তার পরিবার চরম অনিরাপত্তা ও নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েন। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বা মামলা না করার জন্য প্রায় ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করা হয়। এই চাপ মাঝেমাঝে এতো ভয়াবহ হয় যে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয় বা ভিক্টিম সুইসাইড করতে বাধ্য হয়।

অনেকক্ষেত্রেই ধর্ষকের সঙ্গে পলিটিক্যাল পার্টি, স্থানীয় নেতা ও মাস্তানদের যোগাযোগ থাকে। ফলে ধর্ষক, ধর্ষণের শিকার মেয়ে ও তার পরিবারের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী থাকে। এমনকি এইসব যোগাযোগের কারণে প্রশাসনও মাঝেমধ্যে দুর্বল ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, মামলা দায়ের, ডাক্তারি পরীক্ষা থেকে শুরু করে আদালতে বিচার চলা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার নারীকে দফায় দফায় হেনস্তা হতে হয় ও হুমকির মুখে পড়তে হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সমাজে নারীর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে, বাড়ছে মর্যাল পুলিশিং। কট্টরবাদীরা নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। মেয়েরা যেন ভয় পায়, বাইরে কম বের হয়, আধুনিক পোশাক না পরে, নিজের মতামত প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা না করে, রাতে বেড়ানো বন্ধ করে, বোরকা ছাড়া বের না হয় এসবই তারা চাইছে, এজন্যই নারীর ওপর হামলা করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। ঘটনার পর সমাজ যখন প্রশ্ন করে, “মেয়েটি কেন বাইরে ছিল?” “সে কেন এমন পোশাক পরেছিল?” তখন অপরাধী মানসিক অনুমোদন পায়, অর্থাৎ সমাজের নীরব সমর্থন পায় অপরাধী। এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ঝড়পরধষ অঢ়ঢ়ৎড়াধষ ড়ভ ঠরড়ষবহপব .

কয়েকমাস আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন বলেছিলেন ’ধর্ষণ’ শব্দটা শুনতে ভালোলাগে না, একে ‘নারী নির্যাতন’ বলা যায় কিনা? আমরা মনে করি এই মনোভাব ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধকে শুধু ’নারী নির্যাতন’ বা ’নারী নিপীড়ন’ বলে হালকা করার চেষ্টা। দুই অপরাধের ক্ষেত্রে আইন, আইনের ব্যাখ্যা ও শাস্তি ও সোশ্যাল কনসিকোয়েন্স ভিন্ন।

নারী নির্যাতন নানান ধরনের হতে পারে। শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও যৌন হয়রানি। একজন নারীকে চড় মারা, গায়ে হাত দেওয়া এক ধরনের অপরাধ, গালাগালি করা আরেক ধরনের অপরাধ। এভাবে প্রতিটি নিগ্রহের চেহারা আলাদা।

এছাড়া, আছে ধর্ষণ অপরাধের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞান ও গুরুত্বহীন আচরণ। ধর্ষণ এবং শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধগুলোকে রাষ্ট্র ও আইন ব্যবস্থা খুব সাধারণ চুরি, ডাকাতির কেসের মতো মনে করে। এই অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে যে জিরো টলারেন্স ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন, এই দিকটায় কেউ গুরুত্ব দেন না। ফলে মামলাগুলো ঝুলে থাকে, অপরাধী সালিশ করার সুযোগ পায়, ভিকটিম ও তার পরিবারকে ভয় দেখায়, সাক্ষী হারিয়ে যায় ও প্রমাণ বা আলামত মুছে যায়।

অপরাধীর শাস্তি না হলে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি হয়। যখন সমাজে দেখা যায় ধর্ষণের পরও অনেকেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে, তখন এটি অপরাধীদের কাছে “গ্রহণযোগ্য আচরণ” হয়ে ওঠে। সেখানে অপরাধীর মনে এক ভয়ংকর বিশ্বাস জন্মে “আমাদের কিছু হবে না”। এই বিশ্বাস ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো দলগত অপরাধকেই বেশি সাহস জোগায়।

দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার এবং সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা কবে জোরদার হবে? এছাড়া কবে জোরদার হবে ভুক্তভোগী সহায়তা যেমন মানসিক কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এইসব সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

কবে আমাদের সমাজ ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, সংবেদনশীল মনোভাব পোষণ করবে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর প্রতি? ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াবে, তাকে দোষারোপ না করে সহানুভূতি জানাবে এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে শূন্য সহনশীলতা গড়ে তুলবে?

২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews