কে না চায় ধনী হতে? ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সবারই থাকে। এর পেছনে কোনো জাদুকরি উপায় বা রাতারাতি ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি আছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে কিছু টেকসই অভ্যাসের সমন্বয়ে সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, কেন ধনী হতে পারছেন না? যদি ধনী না হয়ে থাকেন তাতে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। আশা রাখুন আপনিও একদিন ধনী হতে পারবেন। তবে তার জন্য দরকার নিজেকে কিছুটা পরিবর্তনের।
২. গরিব হয়ে জন্মানো দোষের কিছু নয় বরং গরিব হয়ে মৃত্যুবরণ করা দোষের, বিল গেটসের এই বিখ্যাত উক্তিটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত।
বিল গেটসের এ উক্তিটি মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস ও উদ্যম জাগিয়ে তোলার জন্য একটি দারুণ অনুপ্রেরণা। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া অবস্থায় জন্ম নেওয়াটা কারও নিজের হাতে থাকে না। কিন্তু নিজের চেষ্টা, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই ভাগ্য পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হলেও পরে তা বাস্তব রূপ নিয়েছে।
৩. জীবনযাপনের মান নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিক স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল প্রচুর অর্থ উপার্জন নয় বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া যা সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং সাবলীল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্ভব। আর্থিক স্বাধীনতা হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ না করলেও চলে। এর বদলে সঞ্চয়, ছোটখাটো ব্যবসা বা বিনিয়োগ থেকে আসা আয় দ্বারা সংসারের সব খরচ অনায়াসে পূরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ এ অর্থ দিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত সুন্দর জীবনযাপন করা সম্ভব।
৪. আর্থিক স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের বাইরে খরচ করা। অর্থাৎ আয় যত, খরচ তার চেয়ে বেশি। এই অভ্যাসে অনেকেই অনিয়ন্ত্রিত ঋণের ফাঁদে পড়ে এবং একসময় আর্থিক অস্থিরতার মুখোমুখি হন। এই প্রবণতা মূলত সমাজের চাপ থেকে আসে যেমন দামি গাড়ি, বড় বাড়ি, আধুনিক সব দামি জিনিস কেনার প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা যে মানসিক চাপ আর অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দেয় তা টের পাওয়া যায় অনেক দেরিতে। এখান থেকে মুক্তির উপায় হলো নিজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা মেনে খরচ করা এবং অর্থকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা।
৫. সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা আয় বুঝে ব্যয় করে এবং আয়ের একটি বড় অংশ সঞ্চয় করে তা পুনরায় বিনিয়োগ করে। তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু প্রজন্ম ধরে চর্চা করা সুনির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নীতি, নীরব শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগ অভ্যাসের ফল। কম বেশি আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও সবাই আরও ধনী হতে চায় তবে তা রাতারাতি বা ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে নয়। সুশৃঙ্খল এবং টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে।
৬. সুইজারল্যান্ডে প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে একজন কোটিপতি। এই হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। অথচ গড় আয়ের দিক থেকে সুইজারল্যান্ড হয়তো বিশ্বের শীর্ষ দেশের তালিকায় ওপরের দিকে থাকবে না। তাহলে তাদের এই অবিশ্বাস্য সম্পদের পেছনের জাদুকরি রহস্যটা কী? এ সাফল্যের মূলে আসলে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নয়, আছে তাদের জীবনযাপন ও কিছু অলিখিত নিয়ম। অর্থাৎ সুইসদের কোটিপতি হওয়ার পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নেই বরং কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আর্থিক নিয়ম এবং সুঅভ্যাস তাদের এই সাফল্যের চাবিকাঠি। আসুন, সুইসদের সেই নীরব শৃঙ্খলার কথা জেনে নিই যা বেশির ভাগ মানুষই এড়িয়ে যায়।
৭. সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নগরীতে ইউনাইটেড ন্যাশনস কর্তৃক আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স উপলক্ষে দেশটি ভ্রমণ করার সুযোগ হয় আমার। আর তখনই তাদের অর্থনীতি খুব কাছে থেকে দেখি।
সুইজারল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত একটি ছোট্ট রাষ্ট্র। মুদ্রার নাম সুইস ফ্রাংক। তাদের অর্থনীতি পৃথিবীর অন্যতম স্থিতিশীল অর্থনীতি। সত্যি কথা বলতে কী, আমার জীবনে দেখা সেরা দেশ ভ্রমণের কথা বললে সুইজারল্যান্ডের কথাই বলতে হয়। তাই তো স্মৃতির রেশ এখনো মনজুড়ে উজ্জ্বল।
৮. নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকা আমাদের দেশের মানুষের অন্যতম বড় একটি স্বপ্ন। কিন্তু সুইসদের হিসাবনিকাশটা একেবারেই উল্টো। সেখানে খুব কমসংখ্যক মানুষ নিজের বাড়িতে থাকে। অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষ ভাড়া বাড়িতে বসবাস করে এবং তারা ইচ্ছা করেই সারা জীবন ভাড়া বাড়িতে থাকে। এর কারণ হলো, তারা নিজেদের সব নগদ টাকা ইট-পাথরে আটকে রাখতে চায় না। তারা মনে করে, অহংকার বা সামাজিক স্ট্যাটাসের চেয়ে নগদ টাকা বা ‘ক্যাশ লিকুইডিটি’ অনেক বেশি দরকার। অর্থাৎ সামাজিক মর্যাদার চেয়ে আর্থিক স্বাধীনতাকে তারা বেশি প্রাধান্য দেয়। বাড়ির পেছনে যে বিশাল অঙ্কের টাকাটা খরচ হতো, সেটা তারা অন্য লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে থাকে।
৯. আমাদের দেশের মানুষের ক্ষেত্রে আগে খরচ পরে সঞ্চয় করার মানসিকতাই বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ বেতন পেয়ে খরচ করার পর মাস শেষে যা বাঁচে তাই জমায়। সুইসরা এই নিয়মের ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। তারা বেতন পাওয়ার পর প্রথমেই একটা নির্দিষ্ট অংশ সঞ্চয় খাতে সরিয়ে ফেলে। এটিকে তারা বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের মতোই বাধ্যতামূলক মনে করে।
এখানে কোনো মোটিভেশন বা ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার নেই, পুরোটাই স্বয়ংক্রিয় নিয়মের খেলা। খরচের আগে জমানোই তাদের মূলমন্ত্র।
১০. সুইসরা শুধু দামি ডিগ্রি বা গালভরা পদবির পেছনে ছোটে না। তারা প্রতি বছর তাদের আয়ের একটা অংশ খরচ করে নতুন কিছু শেখার পেছনে। যেমন প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি অর্জন তাদের লক্ষ্য। কারণ তারা জানে, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে একটি নতুন ও যুগোপযোগী দক্ষতা তাদের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
১১. আমাদের অনেকেই আছেন যারা অতিরিক্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে থাকেন। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে খরচ বাড়ে। কারণ যখন ঋণ হিসেবে খরচ করা হয় তখন তা সুদসহ ফেরত দিতে হয়। সঞ্চয় এবং পরিকল্পিত খরচের মাধ্যমে নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত, যা সুইসরা মেনে চলে। আর এজন্যই সুইস সংস্কৃতির মূলে রয়েছে ঋণ থেকে দূরে থাকা। কাজেই অতিরিক্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং অন্যান্য উচ্চ সুদের ঋণ যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করতে হবে।
১২. আমরা সাধারণত একটি বা দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করি কিন্তু সুইসরা সব সময় একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। দৈনন্দিন খরচের জন্য একটি, বিনিয়োগের জন্য একটি। অন্যান্য খাতে যেমন লেনদেনের জন্যও একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকেন। এটি কোনো ভয় থেকে নয় বরং সব ডিম এক ঝুড়িতে না রাখার চিরন্তন বিনিয়োগ নীতিরই একটা অংশ। এটিকে তারা মনে করে বিকল্প পথ খোলা রাখা।
১৩. রাতারাতি ধনী হওয়ার কোনো শর্টকাট রাস্তা সুইসদের অভিধানে নেই। তারা ইঁদুর দৌড়ে বিশ্বাসী নয় বরং ধীরে ধীরে এগোতে পছন্দ করে; তবে তা দৃঢ়তার সঙ্গে। পক্ষান্তরে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ প্রকৃত সুখ-শান্তির বদলে কেবল অর্থ এবং সামাজিক অবস্থানের উন্নতির জন্য একের পর এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে থাকে। সুইসরা মনে করে এটি অনেকটা খাঁচায় আটকে থাকা ইঁদুরের মতো, যে চাকার মধ্যে দৌড়ায় কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে না অর্থাৎ শান্তি ও শৃঙ্খলার নীরব ঘাতক। সুইসরা কিন্তু এ নীতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা প্রকৃত সুখ-শান্তিতে বিশ্বাসী। তারা আয়ের চেয়ে অনেক কম খরচ করে জীবন কাটায় এবং উদ্বৃত্ত টাকা নীরবে বিনিয়োগ করে থাকে। এর মানে এই নয় যে তারা কৃপণতা করে, তারা কেবল ক্ষণিকের লোকদেখানো জাঁকজমকের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি তৃপ্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
১৪. প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্পদ কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সেটাই তাদের চিন্তার মূল জায়গা। সুইসদের এই মডেল খুব সহজ কিন্তু মানাটা বেশ কঠিন। কারণ সুইসদের কাছে সম্পদ মানে শুধু টাকা আয় করা নয় বরং সেই টাকা ধরে রাখা, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং সময়ের হাতে ওই টাকা বহুগুণ বাড়তে দেওয়া।
এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো হইচই নেই। আছে শুধু নীরব এক শৃঙ্খলা। সুইসদের নীরব শৃঙ্খলা বলতে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, সততা এবং অলিখিত কিছু সামাজিক নিয়মের চর্চাকে বোঝায়। এই চর্চাগুলোই সুইজারল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত, শান্ত এবং সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
১৫. এখন প্রশ্ন হলো, আমি, আপনি আমরা সবাই কি দ্রুত ছুটতে চাই, নাকি সুইসদের মতো নীরব শৃঙ্খলার পথে হাঁটতে চাই!!! আসলে এটি মূলত ব্যক্তিগত জীবনদর্শন এবং লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে।
আপনি যদি দ্রুত উন্নতি, তাৎক্ষণিক ফলাফল এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চান তাহলে দ্রুত ছুটে চলা বেছে নিতে পারেন। এতে সাফল্যের গতি যেমন বেশি থাকে, তেমনি মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তাও বেশি থাকে। আর যদি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, মানসিক শান্তি ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আপনার লক্ষ্য হয়, তাহলে সুইসদের মতো নীরব শৃঙ্খলার পথ অনুসরণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক