মারওয়া খায়েরের বাংলা শুনলে মনে হয়, সারাটা জীবন বুঝি বাংলাতেই কাটিয়েছেন। অথচ তাঁর জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। তারপরও কী সুন্দর ঝরঝরে বাংলা বলেন, গিটার বাজিয়ে পছন্দের বাংলা গানে সুর তোলেন। তাঁর গান কিংবা বাংলাচর্চা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার মতো সময় অবশ্য পাওয়া গেল না। কেননা কিছুক্ষণ পরই তাঁকে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টদের (পিএসএ) প্রশিক্ষণ দিতে ছুটতে হবে। তার আগেই তাঁর পিএসএ থেকে প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই।
২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে চাকরি করতেন মারওয়া খায়ের। তার আগে ওষুধের দোকান আর মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর ভেবেছিলেন, এই চাকরিতেই থিতু হবেন। কিন্তু ২০০৮–০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাংকিং খাতের চাকরিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে নতুন কোনো পেশা খুঁজতে শুরু করেন।
সে সময় ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) কাজ করতেন এক বন্ধু। তিনিই মারওয়াকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা তাঁকে এই পেশার প্রতি আগ্রহী করে।
আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড ও ডিএলআর—মূলত এই তিন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলে লন্ডনের মেট্রোরেলব্যবস্থা। এর মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে ৪৫টি স্টেশনে বিস্তৃত ডিএলআর। প্রায় ৪০ বছর আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেলব্যবস্থা প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে। স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে চালকের বদলে একজন করে পিএসএ থাকেন। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামার পর আবার যাত্রা শুরুর আগে দরজা নিরাপদে বন্ধ করা এবং ট্রেনকে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা পিএসএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাস্টমার সার্ভিস দেওয়াও তাঁর কাজের অংশ। ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা, ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়া—এসবও করতে হয়। লন্ডনে বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করেন, পর্যটকের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনে অনেক যাত্রী আছেন, যাঁদের কেউ কেউ ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন কিংবা লন্ডনের ম্যাপ বুঝতে সমস্যায় পড়েন। তাঁদের গন্তব্যে যাওয়ার পথ বুঝিয়ে দেওয়াও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টের দায়িত্ব। খোঁজখবর নিয়েই ডিএলআর পদে আবেদন করেন মারওয়া। ‘এখানে কাজ করতে টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজনীয় সবকিছুই চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়,’ বলছিলেন মারওয়া।
প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণ। এরপর আরও দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন। এ সময় লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই ধরনের পরীক্ষাই দিতে হয়। সব ধাপ সফলভাবে শেষ করার পর মেলে ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে ট্রেন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন মারওয়া।