মুঃ শফিকুল ইসলাম

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে-এটি জনমনে উদ্বেগের প্রতিফলন। তবে সর্বশেষ মাঠতথ্য ও স্বাস্থ্যপরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সংক্রমণের মূল চালিকাশক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং টিকাদানের ঘাটতি, অপূর্ণ ডোজ এবং নজরদারির দুর্বলতাই বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

সারাদেশের চিত্র-সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ) থেকে শুরু করে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকার কয়েকটি ক্লাস্টারে হামের কেস বাড়ছে। গত তিন মাসে বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে শত শত শিশু হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে; একাধিক জেলায় শিশুমৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত। অনেক হাসপাতালে আইসোলেশন শয্যা সীমিত হওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে, এবং গুরুতর রোগীদের বড় শহরে রেফার করতে হচ্ছে।

ঝুঁকির কেন্দ্র-টিকাদানের ফাঁক : ডাটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই পূর্ণ টিকাদানের আওতায় ছিল না। দেশে প্রথম ডোজ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার কভারেজ তুলনামূলক বেশি (প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি) হলেও দ্বিতীয় ডোজে তা ৭০–৮০% এ নেমে আসে। এই ‘ড্রপআউট’ গ্যাপই সংক্রমণের জন্য বড় পকেট তৈরি করছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে রুটিন ইপিআই কার্যক্রমে বিঘ্ন, শহরের বস্তি ও প্রান্তিক এলাকায় ফলো-আপের ঘাটতি, এবং টিকা নিয়ে গুজব-সব মিলিয়ে ঝুঁকি বেড়েছে।

সহায়ক কারণ-অপুষ্টি ও ঘনবসতি : অপুষ্ট শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হাম হলে জটিলতা দ্রুত বাড়ে-নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও চোখের সমস্যার ঝুঁকি দেখা দেয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, শ্রমজীবী পরিবারের অনিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন সংক্রমণ বিস্তারে সহায়ক হচ্ছে।

স্কুল বন্ধ-সমাধান নাকি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া? : রিটের প্রেক্ষিতে স্কুল বন্ধের আলোচনা জোরাল হলেও তথ্য বলছে, হামের প্রধান বিস্তার ঘটে টিকাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে, যা ঘর-বাড়ি ও কমিউনিটি স্তরে ছড়ায়। কোভিড-অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে শেখার ক্ষতি, পুষ্টি ঘাটতি এবং মানসিক চাপ বাড়ে। তাই সর্বাত্মক বন্ধের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা-স্কুলে অসুস্থ শিশুদের সাময়িক বিরতি, স্বাস্থ্যবিধি জোরদার, এবং স্কুলভিত্তিক টিকাদান-বেশি কার্যকর হতে পারে।

করণীয়-তথ্যনির্ভর দ্রুত পদক্ষেপ :

১) ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন : যেসব শিশু দ্বিতীয় ডোজ মিস করেছে বা একেবারেই টিকা নেয়নি, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ ক্যাম্পেইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২) ডিজিটাল ট্র্যাকিং : জন্মনিবন্ধন/ইপিআই ডাটাবেস সমন্বয় করে শিশুপ্রতি টিকা-স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

৩) স্কুল-ভিত্তিক উদ্যোগ : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী টিকাকেন্দ্র, সচেতনতা সেশন, এবং লক্ষণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং চালু করা।

৪) রিস্ক কমিউনিকেশন : টিকা নিয়ে গুজব প্রতিরোধে গণমাধ্যম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত প্রচারণা।

৫) হাসপাতাল প্রস্তুতি : জেলা-উপজেলা হাসপাতালে আইসোলেশন বেড, অক্সিজেন সাপোর্ট, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা; রেফারেল প্রোটোকল দ্রুততর করা।

৬) পুষ্টি সহায়তা : ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন ও শিশু পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার।

উপসংহার : হাম প্রতিরোধযোগ্য-শুধু দুটি ডোজ টিকা যথাসময়ে নিশ্চিত করতে পারলেই বড় অংশের ঝুঁকি কমে যায়। তাই আতঙ্কনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, তথ্যনির্ভর পদক্ষেপই এখন জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবি জনউদ্বেগের প্রতিফলন হলেও স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে টিকাব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ, কার্যকর নজরদারি এবং শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতিতে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে, প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ আবারও বড় জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews