লাহোরে তৈরি সপ্তদশ শতাব্দীর এক অনন্য জ্যোতির্বিজ্ঞান যন্ত্র বা ‘অ্যাস্ট্রোল্যাব’ লন্ডনের সোথবি’স নিলামঘরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এই পিতলের বিশাল যন্ত্রটি ২০ লাখ পাউন্ডেরও বেশি (প্রায় ২.৭৫ মিলিয়ন ডলার) দামে বিক্রি হয়েছে। যেটা কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং মুঘল আমলের বহনযোগ্য একটি অ্যানালগ কম্পিউটার বা বর্তমানের স্মার্টফোনের প্রাচীন সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

সোথবি’স-এর মতে, এটি ইসলামি বিশ্বের কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের নিলামে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম। এর আগে ২০১৪ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ-এর একটি ছোট অ্যাস্ট্রোল্যাব প্রায় ১০ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল।

‘অ্যাস্ট্রোল্যাব’ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান এই যন্ত্রটির একটি গৌরবময় রাজকীয় ইতিহাস রয়েছে। এটি পশ্চিম ভারতের রাজস্থান রাজ্যের জয়পুর শহরের মহারাজ দ্বিতীয় সাওয়াই মান সিংয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অমূল্য রত্ন ছিল। তার মৃত্যুর পর এটি তার স্ত্রী এবং সে সময়ের অন্যতম সুন্দরী ও প্রভাবশালী নারী মহারানি গায়ত্রী দেবীর কাছে হস্তান্তরিত হয়। জীবনের শেষভাগে এটি একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে।

যন্ত্রটি ১৬৩৭ সাল নাগাদ তৎকালীন মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান শহর লাহোরে (বর্তমান পাকিস্তান) তৈরি করা হয়েছিল। এটি ‘লাহোর স্কুল অব অ্যাস্ট্রোল্যাব মেকার্স’-এর দুই বিখ্যাত ভাই—কাইম মুহাম্মদ এবং মুহাম্মদ মুকিমের যৌথ উদ্ভাবন।

সাধারণ অ্যাস্ট্রোল্যাবের তুলনায় এটি প্রায় চারগুণ বড়। এর ওজন ৮ দশমিক ২ কেজি এবং উচ্চতা প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার। এর বিশালত্ব এবং আভিজাত্যই প্রমাণ করে, এটি কোনো সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য নয়, বরং উচ্চপদস্থ কোনো অভিজাতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

লাহোরের তৎকালীন প্রশাসক আকা আফজাল এটি তৈরির ফরমায়েশ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের আমলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

বড় পরিবর্তন আসতে পারে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে

বড় পরিবর্তন আসতে পারে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে

এই যন্ত্রটির একটি অনন্য দিক হলো এর লিপি। নক্ষত্র ও গ্রহের নামগুলো ফারসি ভাষায় খোদাই করা থাকলেও, তার ঠিক নিচেই দেবনাগরী লিপিতে সংস্কৃত প্রতিশব্দ খোদাই করা আছে। এটি মুঘল আমলের বৈজ্ঞানিক চর্চায় হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির অসাধারণ মেলবন্ধনকে তুলে ধরে।

অক্সফোর্ড সেন্টারের ইতিহাসবিদ ড. ফেদেরিকা গিগান্তে এই যন্ত্রটিকে আধুনিক স্মার্টফোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, এটি একটি ত্রিমাত্রিক মহাকাশকে দ্বিমাত্রিক তলে প্রক্ষেপণ করার যন্ত্র। এর বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে ছিল: সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং নামাজের সময় নিখুঁতভাবে নির্ধারণ; নক্ষত্রের অবস্থান এবং কাবার (মক্কা) সঠিক দিক নির্ণয়; কোনো ভবনের উচ্চতা বা কূপের গভীরতা পরিমাপ করা; রাশিফল তৈরি এবং ভবিষ্যৎ গণনার জন্য পঞ্জিকা হিসেবে ব্যবহার।

সোথবি’স-এর ভারতীয় ও ইসলামিক আর্ট বিভাগের প্রধান বেনেডিক্ট কার্টার জানান, এ যন্ত্রটিতে মোট ৯৪টি শহরের নাম এবং সেগুলোর সঠিক দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশ খোদাই করা আছে। এতে পাঁচটি সূক্ষ্মভাবে ক্যালিব্রেট করা প্লেট রয়েছে। এর ডিগ্রি বিভাজনগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে তা ১ ডিগ্রির তিন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপতে সক্ষম। এই স্তরটি তৎকালীন লাহোর ঘরানার কারিগরি উৎকর্ষের চূড়ান্ত উদাহরণ।

এই অ্যাস্ট্রোল্যাবটি কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু নয়, বরং এটি প্রমাণ করে মুঘল দরবারে বিজ্ঞান, বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিত কতটা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। লন্ডনের গ্যালারিতে প্রদর্শনী শেষে এটি এখন এক অজ্ঞাতনামা সংগ্রাহকের সংগ্রহশালা আলোকিত করবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews