ভোটার তালিকা বিতর্কই কি পশ্চিমবঙ্গে ভোটের খেলা ঘুরিয়ে দেবে?

ছবির উৎস, The India Today Group via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরের বাইরে অভিষেক ব্যানার্জী এবং অন্যান্যদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী

    • Author,

      শুভজ্যোতি ঘোষ

    • Role,

      বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

  • ২ ঘন্টা আগে

  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতন্ত্রে নির্বাচন লেগেই থাকে – প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সারা দেশে সংসদীয় নির্বাচন ছাড়াও প্রতি বছরই অনেকগুলো রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন এখন প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস বলে, এই ভোটগুলোয় কখনো লড়াই হয় উন্নয়নের প্রশ্নে, কখনো ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে – আবার কখনো নেহাত জাতপাত সংরক্ষণের প্রশ্নে, অথবা হয়তো স্রেফ পেঁয়াজের দাম বাড়ার মতো ইস্যুতে।

কিন্তু একটা ভোটে প্রধান ইস্যুই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক – এমনটা ভারতীয় গণতন্ত্রের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কখনও ঘটেনি।

অথচ পশ্চিমবঙ্গে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে আর সব প্রসঙ্গকে পেছনে ফেলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া, পোশাকি ভাষায় নির্বাচন কমিশন যার নামকরণ করেছে 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন', সংক্ষেপে 'এসআইআর'।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্যের যে 'চূড়ান্ত ভোটার তালিকা' প্রকাশ করেছে, তাতে আগেই বাদ যাওয়া ৫৮ লাখ ভোটারের সঙ্গে আরো ৬০ লাখ ভোটারের নাম 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' বা বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে বাদ গেছে আরও ৫ লাখ নাম।

এই ৬০ লাখের মধ্যে এক তৃতীয়াংশই আবার রাজ্যের মাত্র দুটি মুসলিম অধ্যুষিত জেলা থেকে – মালদা ও মুর্শিদাবাদ।

এসআইআরের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্-র সংবাদ সম্মেলন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এসআইআরের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্-র সংবাদ সম্মেলন

কমিশন সূত্রে আরও ইঙ্গিত মিলেছে, 'বিবেচনাধীন' ক্যাটাগরিতে যাদের নাম রয়েছে, তারা কেউই প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে পারেনি এবং ভোটের আগে আর মাত্র অল্প কয়েকদিনের ভেতর তারা সঠিক কাগজ দেখিয়ে তালিকায় নাম তোলাতে পারবেন, সেই সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি ধরে নেওয়া যায়, অর্ধেক 'বিবেচনাধীন' ভোটারও শেষ পর্যন্ত তালিকায় নাম তুলতে পারলেন, তারপরও গত অক্টোবর মাসের ৭.৬৬ কোটি ভোটারের তালিকা থেকে শেষ পর্যন্ত কোটিখানেকেরও বেশি নাম বাদ পড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটা নির্বাচনেই চিরকাল আগের নির্বাচনের চেয়ে ভোটারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে – এবার এক ধাক্কায় এক কোটির বেশি ভোটার কমে গেলে সেটা হবে এক অভূতপূর্ব ঘটনা, আর তার অভিঘাতেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে।

এসআইআরে রাজনৈতিক অংকটা কী?

'এসআইআর' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাম তোলাতে নিরীহ সাধারণ মানুষের যে চরম ভোগান্তি হয়েছে, তালিকায় নাম থাকবে কি থাকবে না- তা নিয়ে যে প্রবল উৎকণ্ঠায় পড়তে হয়েছে, সেটাকেই এই নির্বাচনে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস যথারীতি নির্বাচনে বড় ইস্যু করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী 'এসআইআর' নিয়ে মামলা ঠুকে নিজে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছেন, নির্বাচন কমিশনারকে 'বিজেপির দালাল' বলে অভিহিত করে প্রকাশ্য সংঘাতে নেমেছেন এবং তাঁর প্রতিটা পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট এসআইআর-জনিত ভোগান্তিই হবে এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান হাতিয়ার।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার

গত পনেরো বছরের একটানা তৃণমূল সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতা, শিক্ষকের চাকরি বিক্রি বা রেশন কেলেঙ্কারির মতো দুর্নীতি, আরজিকর হাসপাতালের তরুণী ডাক্তারের খুন ও ধর্ষণের ঘটনা – এর সবই এখন আড়ালে চলে যাবে বলে দলটির নেতাদের বিশ্বাস।

এসআইআরের কারণে নিরীহ সাধারণ মানুষের অযথা ভোগান্তি আবার রাজ্যে বিরোধী দল বিজেপিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে যথারীতি – কারণ এই বিজেপিই সবচেয়ে বেশি এসআইআর করানোর দাবিতে সরব ছিল।

তা ছাড়া তৃণমূলের লাগাতার প্রচারের ধাক্কায় অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করছেন যে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনও আসলে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপিরই 'বি' টিম। ফলে কমিশনের যাবতীয় ব্যর্থতা আর ভুলভ্রান্তির দায় বিজেপিকেই পোহাতে হচ্ছে।

এই অসন্তোষের ধাক্কা তাদের সামলাতে হবে, এটা মানলেও বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য দাবি করছেন, যে কোটিখানেক ভুয়া বা মৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, সেটাতে আখেরে তাদের লাভই হবে, কারণ এই ভোট আগে তৃণমূলের ঝুলিতেই যেত।

তথাকথিত 'বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের' নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে একটি নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা ছাড়া রাজ্যে 'পরিবর্তন' সম্ভব নয় - নেতাকর্মীদের এই বার্তা দিয়ে বিজেপি রাজ্যের হিন্দু ভোট সংহত করারও চেষ্টা চালাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের ‘এসআইআর ভিক্টিম’দের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে তৃণমূল নেত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

ছবির ক্যাপশান,

পশ্চিমবঙ্গের 'এসআইআর ভিক্টিম'দের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে তৃণমূল নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী

কাজেই লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গে প্রতিপক্ষ প্রধান দুটি দলই মনে করছে, ভোটে তারা জিতলে এসআইআর-ই তাদের জেতাবে!

তৃণমূলের অংক, এই তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরক্ত মানুষ দলের সব ভুলভ্রান্তি মাফ করে আবার তাদের ওপরেই ভরসা রাখবেন।

আর বিজেপির হিসাব, 'ভুয়া তৃণমূল ভোটার'রা তালিকা থেকে ঢালাওভাবে বাদ পড়ায় তাদের এবার না জেতার কোনো কারণই নেই!

দুটোর যে কোনোটাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হতে পারে, আর সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে এসআইআর-কে 'গেমচেঞ্জার' বা খেলা ঘোরানোর প্রকরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

মমতা ব্যানার্জীর নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাতে আর সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করতে গত মাসে বহু দিন পর যখন দিল্লি এসেছিলেন, তখন দেখা হতেই হাতে একটা ছোট পুস্তিকার আকারের বই ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

বইটার নাম দেখলাম 'এসআইআর – ২৬ ইন ২৬', ইংরেজিতে ২৬টি ছোট কবিতার সংকলন। লিখেছেন তিনি নিজেই।

এসআইআর নিয়ে মমতা ব্যানার্জীর লেখা কবিতা সংকলনের প্রচ্ছদ।

ছবির ক্যাপশান,

এসআইআর নিয়ে মমতা ব্যানার্জীর লেখা কবিতা সংকলনের প্রচ্ছদ

বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে 'এই ধ্বংসের খেলায় যারা জীবন হারিয়েছেন', তাদের। 'ধ্বংসের খেলা'টা বলতে যে এসআইআর, তা যথারীতি বলার অপেক্ষা রাখে না!

প্রসঙ্গত, এসআইআর-এর চাপ না নিতে পারে এর মধ্যেই অজস্র বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) প্রাণ হারিয়েছেন বা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, অনেক প্রবীণ বা অসুস্থ মানুষ শুনানির ডাক পেয়ে হার্ট অ্যাটাক করেছেন – এমন অনেক অভিযোগ উঠেছে।

মমতা ব্যানার্জী জানালেন, এ বছর গঙ্গাসাগর মেলায় যাওয়ার সময় হেলিকপ্টারে বসেই কবিতাগুলো তিনি লিখে ফেলেছেন – কারণ এসআইআর প্রক্রিয়ার ভোগান্তিতে যে মৃত্যুর মিছিল, তা তাঁকে চুপ থাকতে দেয়নি।

এসআইআর নামক এক্সারসাইজে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বয়সের মানুষের – পঁচিশ থেকে পঁচাশির যে দুর্ভোগ, কাজের চাপে কর্মকর্তাদের মৃত্যুর অভিযোগ, হিয়ারিং-এর নামে হেনস্থা এবং তালিকায় নাম ওঠা নিয়ে উদ্বেগ-আশঙ্কা – সেটাকেই আগামী ভোটে প্রধান বা একমাত্র ইস্যু করে তুলতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।

মমতা ব্যানার্জী এসআইএর-কে অস্ত্র হিসেবে দিল্লি তোলপাড় করে ফেলতে চাইছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলেছেন।

দিল্লির দিল্লির সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী।

ছবির উৎস, The India Today Group via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লির সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী

এখন তার রণকৌশল ঠিক না ভুল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে আর বড়জোর মাসদু'য়েকের ভেতরেই।

তবে ছাব্বিশের ভোট তিনি যে এই হাতিয়ারেই লড়বেন, সেটা এখন স্পষ্ট।

দিল্লির সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর পাশে বসে তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেক ব্যানার্জীও বারবার বলার চেষ্টা করলেন, ভোটার তালিকাকে ক্রুটিমুক্ত করার চেষ্টায় তাদেরও সায় আছে – সুতরাং তৃণমূল এসআইআর-এর সরাসরি বিরোধিতা করছে, বিষয়টা তেমন নয়।

"কিন্তু যে কাজটা ধীরেসুস্থে দু'বছর ধরে করার কথা, সেটা দুমাসে তাড়াহুড়ো করে এভাবে করার কী দরকার ছিল?", প্রশ্ন তাঁর।

কিন্তু এত লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়লে সেটা কি তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাবে না?

দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী জবাব দিচ্ছেন, "ধরুন চারজন বৈধ ভোটারের একটি পরিবারের বিনা কারণে একজনের নাম বাদ পড়েছে।"

"এখন পরিবারের সেই বাকি তিনজনের ভোট – তারা যদি এমনিতে তৃণমূলের ভোটার না-ও হন – এখন কি বিজেপির বিরুদ্ধেই যাবে না, আপনারাই বলুন!"

এসআইআর সঙ্ক্রান্ত নোটিস পেয়ে নথি জমা দেওয়ার ভিড়, শিলিগুড়িতে তোলা ছবি।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এসআইআর সংক্রান্ত নোটিশ পেয়ে নথি জমা দেওয়ার ভিড়, শিলিগুড়িতে তোলা ছবি

বিজেপি কীভাবে সামাল দেবে?

এসআইআর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এই যে বিতর্ক, তার নানা দিক নিয়ে বিবিসির দীর্ঘ কথাবার্তা হয় রাজ্যে দলের প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের সঙ্গে।

বিজেপির এই আইনজীবী নেতাএটা স্বীকার করছেন যে, এই প্রক্রিয়ার কারণে রাজ্যে অনেক নিরীহ মানুষের চরম ভোগান্তি হয়েছে।

কারও বৃদ্ধ বাবা-মাকে হুইলচেয়ারে চাপিয়ে নিয়ে এসে বুথ অফিসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়েছে। কিংবা যে একটি কেন্দ্রের চার পুরুষ ধরে ভোটার, তাকেও সব কাজ ফেলে শুনানিতে হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে, তার তালিকায় নাম থাকার অধিকার আছে।

"কিন্তু তারপরও আমরা বিশ্বাস করি একটি নির্ভুল ভোটার তালিকার স্বার্থে মানুষ এই সাময়িক ভোগান্তি মেনে নেবেন"।

"কলকাতার উপকণ্ঠে 'মিঠু কলোনি' যখন রাতারাতি 'মাসুদ কলোনি' হয়ে যায়, অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে যায় – তখন এই এসআইআর করা ছাড়া উপায় থাকে না। আমাদের রাজ্যের সচেতন মানুষ অবশ্যই সেটা বুঝবেন", বলছিলেন দেবজিৎ সরকার।

এসআইআর প্রক্রিয়াতে বিচ্যুতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে নির্বাচন কমিশনে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এসআইআর প্রক্রিয়াতে ত্রুটিবিচ্যুতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে নির্বাচন কমিশনে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী

পাশাপাশি এসআইআর নিয়ে রাজ্যে যত 'বিতর্ক, বিলম্ব ও বিভ্রান্তি' হয়েছে – তিনি তার জন্যও দায়ী করছেন প্রতিপক্ষ তৃণমূলকেই।

যুক্তি দিচ্ছেন, দেশের মোট ১১টা রাজ্যে এসআইআর হয়েছে, তার মধ্যে এত ঝামেলা ও বাগবিতন্ডা হয়েছে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই!

"বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো তো ছেড়েই দিলাম, কেরালা বা তামিলনাডুতেও কিন্তু ঠিক সময়ে ও মসৃণভাবে এসআইআর শেষ হয়েছে। সেখানে হয়তো কোনো পদ্ধতিগত প্রশ্ন উঠেছে, সেটাও ঝটপট মীমাংসা হয়ে গেছে।"

"আর পশ্চিমবঙ্গে দেখুন, তৃণমূল সমর্থক ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের অসহযোগিতার কারণে কাজ এগোতেই পারেনি। শাসক দল ইচ্ছে করে তালিকা সংশোধনের কাজে বাধা দিয়েছে", অভিযোগ করছেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন মানেই কি বিজেপি?

মমতা ব্যানার্জী তার শেষ দিল্লি সফরে সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিজেপির পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি কমিশনকে সরাসরি 'বয়কট' করার কথাও ঘোষণা করেছেন।

ভারতের রাজধানীতে অশোকা রোডে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়, সেটাকেও পশ্চিমবঙ্গবাসীদের অনেকে মোদী সরকারের 'অংশ' হিসেবে অভিযোগ করে থাকেন, রাজ্যের বিজেপি নেতারা তা জানেন।

নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির মধ্যে আঁতাতের অভিযোগ এনে কংগ্রেসের বিক্ষোভ সমাবেশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির মধ্যে আঁতাতের অভিযোগ এনে কংগ্রেসের বিক্ষোভ সমাবেশ

তবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পদ্ধতি পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সব ঢিলেমি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে, তার জন্য বিজেপি নেতৃত্ব প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও নিশানা করছেন।

"আমরা ওঁনার উদ্দেশে বারবার বলেছি, দিল্লিতে বসে জ্ঞান দিলে হবে না, আপনি পশ্চিমবঙ্গে আসুন, সরেজমিনে দেখে মানুষের অভাব-অভিযোগগুলোর প্রতিকার করুন। কিন্তু ওনারা তা কানেই তোলেননি", বেশ আক্ষেপের সুরেই বলেন রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র মি সরকার।

এই যে রাজ্যের মানুষ কমিশনের ত্রুটির কারণেও চূড়ান্ত নাকাল হয়েছে ও এখনও হয়ে চলেছে – এবং কমিশনের ব্যর্থতাকে বিজেপির ব্যর্থতা হিসেবেই অনেকে দেখছেন – ভোটের ময়দানে এই ধারণাটাকে বিজেপি কীভাবে মোকাবিলা করবে?

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি কিন্তু আশাবাদী, দশ বছর আগে নরেন্দ্র মোদীর 'নোটবন্দী'র সময় মানুষ যেভাবে ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক দুর্ভোগ 'দেশের স্বার্থে' সয়ে নিয়েছিলেন – এবারেও তার পুনরাবৃত্তি হবে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তো কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এসআইআর নিয়ে হাজারো বিরক্তি, সংশয়, উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ?

এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কলকাতায় বামপন্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশে পোস্টার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কলকাতায় বামপন্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশে পোস্টার

এ ব্যাপারে দেবজিৎ সরকার জবাব দেন, "দেখবেন, মানুষ ইভিএমে বোতাম টেপার সময় ওসব ভোগান্তির কথা বেমালুম ভুলে যাবে।"

"চৌত্রিশ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে বামফ্রন্টের পক্ষে সবচেয়ে বড় মিছিলটা হয়েছিল তাদের সপ্তম সরকারের একেবারে শেষ দিকে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্র হয়েছিল তখন।"

"কেউ ভাবতেও পারেনি তার কয়েক মাসের মধ্যে সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের কেন্দ্রে ষাট হাজারেরও বেশি ভোটে হেরে যাবেন ... অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার কোনোদিন তৈরিই হবে না!"

এবারেও মমতা ব্যানার্জীর সরকারের বিরুদ্ধে চাপা জনরোষ এতটাই তীব্র যে মানুষ 'পরিবর্তনে'র জন্য মনে মনে তৈরি হয়ে আছেন – এসআইআরের দুর্ভোগ তাতে কোনো ফারাক ফেলবে না বলেই বিজেপি আশা করছে।

অনেকেরই সম্ভবত মনে আছে, পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল 'খেলা হবে'।

সেবারে মূলত 'খেলা' হয়েছিল তৃণমূল ব্র্যান্ডের বাঙালি সংস্কৃতি বনাম বিজেপির 'আমদানি করা' কথিত 'অবাঙালি সংস্কৃতি'র মধ্যে – যে লড়াই বিজেপি জিততে পারেনি।

এবারে রাজ্যে ভোটের খেলার ভোল কেউ বদলাতে পারলে সেটা হবে অবশ্যই এসআইআর – তা সে যে পক্ষের পালেই হাওয়া তুলুক না কেন!



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews