মাত্র দুটি সংসদীয় আসন ও ৩২টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ছোট জেলা ঝালকাঠি থেকে এবার সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন চারজন সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগ পাওয়ায় দক্ষিণের এই জেলায় বইছে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। এমন রাজনৈতিক সমীকরণ আগে কখনও দেখা যায়নি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এবারের ব্যবস্থায় দুই আসন থেকে চারজন সংসদ সদস্যের পাশাপাশি বুধবার বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা লাভ করেছেন। ফলে চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলার বাসিন্দাদের নানা প্রান্তের প্রতিনিধিত্ব এবার সংসদ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল, তার গ্রামের বাড়ি রাজাপুর উপজেলায়। একই সঙ্গে এ আসনে কাঠালিয়া উপজেলায় জন্ম নেওয়া এনসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে।

অন্যদিকে ঝালকাঠি-২ (ঝালকাঠি সদর-নলছিটি) আসন থেকে বিএনপির সাবেক জেলা সম্পাদক ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিজ উপজেলা নলছিটি। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি মনোনীত কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসিন্দা জেবা আমিন খান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন।

ফলে সংসদে ঝালকাঠির প্রতিনিধিত্ব রাজাপুর, নলছিটি, ঝালকাঠি সদর ও কাঠালিয়া—এই চার উপজেলার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই জেলার ভিন্ন ভিন্ন এলাকার চারজন সংসদ সদস্য থাকা যেমন বিরল, তেমনি সম্ভাবনাময়ও। তাদের মতে, এতে প্রতিটি এলাকার সমস্যা আলাদাভাবে সংসদে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে একটি আসনের সমস্যা অনেক সময় অন্য এলাকার গুরুত্ব পেত না, কিন্তু এখন প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার বিষয়গুলো আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।

এদিকে বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার স্বপনকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কার্যবিধি, ১৯৯৬-এর ৩বি (২) ধারা অনুযায়ী তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করবেন।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় ৩৫টি দেশে টেকসই স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন খাতে তিন দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছেন।

তিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছেন। তিনি ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডজাঙ্কট সহযোগী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস, ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুষ্টিতে স্নাতকোত্তর এবং সুইডেনের উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে আশির দশকে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে তার পথচলা শুরু হয়। তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। গত বছরের ১০ মার্চ তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান এবং দলের স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি গ্রাসরুট নেটওয়ার্কের টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার নৈকাঠির সন্তান ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারের বাবা মরহুম হরমুজ আলী একজন সিনিয়র সহকারী সচিব ছিলেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

নিয়োগের প্রতিক্রিয়ায় ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী, সমন্বিত ও টেকসই করতে তিনি কাজ করবেন। তিনি বলেন, 'প্রাইমারি হেলথকেয়ার ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে হবে। কারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে চাই। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব।'

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্ব বাস্তব উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, এসব খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এবার বেশি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন অনেকে।

তাদের মতে, একই জেলার চারজন সংসদ সদস্য থাকায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে জেলার উন্নয়ন দ্রুততর হবে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চার প্রতিনিধির মধ্যে দলীয় বৈচিত্র্য থাকায় সংসদে ঝালকাঠির কণ্ঠ আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। সরাসরি নির্বাচিত দুই সাংসদের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনে ভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব বিষয়টিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে।

তবে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, সমন্বয়ের অভাব হলে এই সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি কিছুটা শ্লথ করে দিতে পারে।

বিডি প্রতিদিন/এম.এস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews