২০২১ সালের ৪ অক্টোবর। জ্যামাইকার স্যাংস্টার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে তখন পর্যটকদের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোচ্ছিলেন ৪৩ বছর বয়সী এক নারী। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নাও ছিল প্রবল। তার হাতে থাকা টিকিটটি ছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের। জ্যামাইকাকে কেবল একটি ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে তিনি আটলান্টিক পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই তার পথ রোধ করে জ্যামাইকান পুলিশ ও ইন্টারপোলের একটি বিশেষ দল। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার দীর্ঘ পলায়নচেষ্টা। সেই নারী আর কেউ নন, কানাডার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা বাংলাদেশি অভিবাসী লায়লা সালাম সেজিন।
গল্পটির শুরু ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে। এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সেজিন। স্বামী কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়ায় সে বছরের নভেম্বরে তিনিও কানাডায় যান। কিন্তু সেই নতুন জীবনের স্থায়িত্ব বেশি দিন ছিল না। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে, যখন সেজিন গর্ভবতী, তখন দাম্পত্য বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একপর্যায়ে তারা আলাদা হয়ে যান এবং তার স্বামী ক্ষুব্ধ হয়ে সেজিনের স্পাউসাল স্পনসরশিপ বা স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে সেজিনের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একদিকে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি নেই, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তাও ছিল না। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২০ সালের মার্চে তাদের সন্তানের জন্ম হয়।
সন্তান জন্মের পর থেকেই শুরু হয় আইনি লড়াই। সেজিন অন্টারিওর ফ্যামিলি কোর্টে সন্তানের ভরণপোষণ ও অধিকার চেয়ে মামলা করেন। কিন্তু আদালত যখন বাবাকে নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়, তখন পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত সেজিন বারবার আদালতের আদেশ অমান্য করেন। দীর্ঘ এক বছরে বাবা সন্তানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান মাত্র চারবার।
২০২১ সালের ২৯ মার্চ কানাডার আদালত চূড়ান্ত নির্দেশ দেয় যে প্রতি রবিবার বাবা তার সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। কিন্তু ৪ এপ্রিল, নির্ধারিত সময়ে অপেক্ষা করেও তিনি সন্তানকে পাননি। সেজিনেরও কোনো হদিস মেলেনি। পরে আদালতের আদেশ অমান্য করার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহই তাকে একজন সাধারণ মা থেকে আন্তর্জাতিক পলাতক অপরাধীতে রূপান্তরিত করে।
আদালত যখন মনে করে যে সেজিন বাবার সঙ্গে সন্তানের যোগাযোগ ব্যাহত করছেন, তখন সাময়িকভাবে সন্তানের পূর্ণ হেফাজত বাবার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৯ জুলাই পুলিশ জানতে পারে, সেজিন আর কানাডায় নেই। তদন্তে দেখা যায়, ১১ জুলাই তিনি সন্তানকে নিয়ে গোপনে কানাডা ত্যাগ করেছেন এবং তার গন্তব্য ছিল জ্যামাইকা।
বর্তমান সময়ের কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থার মধ্যে একজন ওয়ান্টেড নারী কীভাবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানে চড়ে অন্য দেশে চলে গেলেন, সেটিই তদন্তকারীদের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকেই তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ভুয়া নথি ব্যবহারের অভিযোগ জোরালো হয়ে ওঠে।
জ্যামাইকায় আটকের পর তাকে কিংস্টন এবং সেন্ট অ্যান্ড্রু প্যারিশ কোর্টে হাজির করা হয়। আদালতকক্ষে তখন টানটান উত্তেজনা। কানাডা সরকার তাকে দ্রুত বহিঃসমর্পণের (Extradition) দাবি জানায়। সেজিনের আইনজীবী প্রিসিলা জেনিংস তার মক্কেলের গুরুতর অসুস্থতা তথা রক্তাল্পতা (Anaemia) ও ডায়াবেটিসের কথা তুলে ধরে মানবিক কারণে জামিন চান।
কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেরেমি টেলর কিউসি কড়া যুক্তি দিয়ে বলেন, “একজন ব্যক্তি যিনি একবার সন্তানকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা পাড়ি দিয়ে পালিয়েছেন, তাকে জামিন দেওয়া মানে আইনের চোখে ধুলো দেওয়ার আরেকটা সুযোগ করে দেওয়া।” বিচারক লরি-অ্যান কোল-মনটেগু জামিন নামঞ্জুর করে সাফ জানিয়ে দেন, সেজিন একজন ‘ফ্লাইট রিস্ক’ (পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পন্ন ব্যক্তি), তাই তাকে হেফাজতে রাখাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে জ্যামাইকা থেকে কানাডায় ফিরিয়ে আনার পর সেজিনের বিরুদ্ধে শুরু হয় মূল বিচার। কানাডার আইন অনুযায়ী ‘অভিভাবক কর্তৃক অপহরণ’ (Parental Child Abduction) একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে নির্দিষ্ট মেয়াদে দন্ডিত করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, তিনি বিচারিক নির্দেশ অমান্য করে সন্তানকে নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন এবং জ্যামাইকা হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। রায়ে সন্তানের পূর্ণ হেফাজত (Sole Custody) তার বাবার কাছে ন্যস্ত করা হয়।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সেজিনের ইমিগ্রেশন অবস্থান যে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, তা বলাই যায়। তার স্বামী আগেই স্পাউসাল স্পনসরশিপ প্রত্যাহার করেছিলেন। এর সঙ্গে একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় কানাডায় তার ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
লায়লা সালাম সেজিনের এই কাহিনীটি কোনো কাল্পনিক থ্রিলার নয়, বরং আইনি পথ এড়িয়ে যাওয়ার এক বাস্তব এবং কঠোর পরিণতি। জেদ আর আবেগের বশবর্তী হয়ে আইনি পথ ছেড়ে অপরাধের পথে পা বাড়িয়ে তিনি হারিয়েছেন তার সংসার, তার সন্তান এবং পরিশেষে নিজের স্বাধীনতাও। কানাডার অভিবাসন ইতিহাসে এই মামলাটি চিরকাল একটি সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র:
The Jamaica Star (১৫ অক্টোবর ২০২১)
Ontario Court of Justice, Sezin v. Sheikh, 2020 ONCJ 187
Government of Ontario, Child abduction by a family member (২৫ অক্টোবর ২০২১)