যদি ধাঁধা ধরা হয়—যে মাছ ধরে আর যে পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়েছে, দুজনের মিল কোথায়? এক কথায় উত্তর, 'জেলে'। তেমনি অদ্ভুত মিল এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। যুক্ররাষ্ট্র এক সময় হাম নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছিল। বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণের সুখবর দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে সেই অর্জন নড়বড়ে হয়ে গেছে। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ল্যাব-নিশ্চিত আক্রান্ত ৪ হাজার ২১০ জন। মারা গেছেন ৪৭ জন। আর ২০০০ সালে হাম নির্মূলের ঘোষণা দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও রোগটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সায়েন্স এলার্ট বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন বিজ্ঞানবিষয়ক সাংবাদিক জেস ককারিল।
চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে হামের রোগী বেড়েছে। গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে হামের এতো রোগী দেশটিতে দেখা যায়নি। এতে দেশটির হাম নির্মূলের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শতকের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল একেবারে ভিন্ন। তখন ভাইরাসটি কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বহু বছরের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির ফল মিলেছিল ২০০০ সালে। সে বছর যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে হাম নির্মূলের ঘোষণা দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং 'আনবায়াসড সায়েন্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা জেসিকা স্টেয়ার বলেন, এটি ছিল জনস্বাস্থ্যের বড় জয়। কিন্তু সেই অর্জন এখন ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে।
২০০০ সালের সেই স্বীকৃতি ২০১১ সালে আবারো নিশ্চিত করা হয়। এরপর আর পর্যালোচনা করা হয়নি।
স্টেয়ার বলেন, হাম নির্মূল মানে ভাইরাস পুরোপুরি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া নয়। এর মানে, ভাইরাস আর কোনো দেশে স্থানীয়ভাবে অবাধে ছড়ায় না। বাইরে থেকে আক্রান্ত কেউ আসতেই পারে। কারণ হাম 'একটি বিমানযাত্রার দূরত্বে' থাকে। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ থামিয়ে দেয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, অন্তত ১২ মাস ধরে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় স্থানীয়ভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য রোগ নজরদারি ব্যবস্থা চালু থাকলে তাকে হাম নির্মূল বলা হয়। এখন আর যুক্তরাষ্ট্রে সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের হামের নজরদারি দল জানিয়েছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যেই সংক্রমিত হয়েছেন। খুব কম মানুষ অন্য অঙ্গরাজ্য বা বিদেশ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ এখন ভাইরাস দেশটির ভেতরেই ছড়াচ্ছে।
তথ্যবিজ্ঞানী লরেন গার্ডনার বলেন, বিপদ জাতীয় গড়ে লুকিয়ে নেই। বিপদ লুকিয়ে আছে ছোট ছোট এলাকায়। কোনো অঙ্গরাজ্যের গড় টিকাদান হার ভালো হতে পারে। কিন্তু সেই অঙ্গরাজ্যের বহু কাউন্টি ও কমিউনিটিতে টিকার হার অনেক কম। সেখান থেকেই বড় প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আমেরিকা অঞ্চলের দপ্তর প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন আগামী নভেম্বরে হাম নির্মূলের অবস্থা পর্যালোচনা করবে।
এদিকে দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতাল ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, বর্তমান রোগতাত্ত্বিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালেই যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূলের মর্যাদা হারাতে পারে।
এর পেছনে বড় কারণ টিকাদানের হার কমে যাওয়া। গত পাঁচ বছরে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকার কভারেজ কমেছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর বহু অঙ্গরাজ্য ও কাউন্টিতে পূর্ণ টিকাগ্রহণের হার আরো নেমে যায়। কিছু এলাকায় টিকাদানের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
গার্ডনার বলেন, পরিসংখ্যান স্পষ্ট। টিকা না নেয়া মানুষের মধ্যে হামের সংক্রমণ টিকা নেয়াদের তুলনায় অনেক বেশি। তবে জাতীয় গড় দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। শত শত কাউন্টি ও কমিউনিটিতে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের গণ-সুরক্ষা সীমার নিচে নেমে গেছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাম নির্মূলের স্বীকৃতি ধরে রাখতে হলে প্রতিটি কমিউনিটিতে এমএমআর টিকার হার ৯৫ শতাংশের ওপরে তুলতে হবে। শুধু অঙ্গরাজ্য বা জাতীয় গড় বাড়ালেই হবে না। কারণ একটি অঙ্গরাজ্যের ভালো গড়ও ভেতরের দুর্বল এলাকাগুলোকে আড়াল করে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা নিয়ে মানুষের দ্বিধাও বড় সমস্যা। অনেক অঙ্গরাজ্যে টিকা থেকে অব্যাহতির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। স্কুলে টিকা নেয়ার নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো জনবল হারিয়েছে। অর্থায়নও কমেছে। ফলে প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। এর সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য মানুষকে টিকা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
স্টেয়ার বলেন, এমএমআর টিকার কভারেজ কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের মূল চালিকাশক্তি। ভুল তথ্য সেই সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। তার ধারণা, আগের অবস্থায় ফিরতে এবং আবার হাম নির্মূলের স্বীকৃতি পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
গার্ডনারও একই সতর্কতা দিয়েছেন। তার মতে, জনস্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু প্রাদুর্ভাবের সময় নয়, শান্ত সময়েও উচ্চ টিকাদান কভারেজ ধরে রাখতে হবে। তা না হলে নির্মূলের স্বীকৃতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
ধাঁধার উত্তর তাই একই থাকে, 'জেলে'। তবে বাংলাদেশ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মিল মাছ ধরা বা পকেট কাটার নয়। বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা হামকে আবারো নিয়ন্ত্রণে আনার লড়াইয়ে।
এর সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। স্টেয়ারের ভাষায়, মানুষকে এমন একমাত্র উপায় থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, যা সত্যিই হাম প্রতিরোধ করতে পারে।
তার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রকে আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। টিকাদানের কভারেজ আগের পর্যায়ে তুলতে হবে। এরপরই আবার হাম নির্মূলের স্বীকৃতি ফিরে পাওয়ার আশা করা যাবে। সেই পথ সহজ হবে না। কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞানী লরেন গার্ডনারও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে, শুধু টিকার হার বাড়ালেই চলবে না। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আবার বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রোগ দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য খাতে প্রায়ই সংকট দেখা দেয়ার পর অর্থায়ন বাড়ানো হয়। অর্থাৎ ব্যবস্থা নেয়া হয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কিন্তু হাম নির্মূলের মতো অর্জন ধরে রাখতে হলে উল্টোটা করতে হবে। প্রাদুর্ভাব না থাকলেও প্রস্তুতি ধরে রাখতে হবে। শান্ত সময়েও টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখতে হবে। নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই নির্মূলের স্বীকৃতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুটি। প্রথমটি হলো, কমিউনিটি পর্যায়ে এমএমআর টিকার হার আবার ৯৫ শতাংশের ওপরে তোলা। দ্বিতীয়টি হলো, টিকা নিয়ে মানুষের অনীহা ও বিভ্রান্তি দূর করা। এই দুটি লক্ষ্য পূরণ না হলে হামের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে।
চলতি বছরের প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, জাতীয় গড় ভালো থাকলেই বিপদ কেটে যায় না। একটি অঙ্গরাজ্যের ভেতরে কয়েকটি কমিউনিটির দুর্বল টিকাদানও পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সেখান থেকেই ভাইরাস আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই ধাঁধার উত্তর শেষ পর্যন্ত একই থাকে—'জেলে'। তবে বাংলাদেশ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মিল মাছ ধরা বা পকেট কাটার নয়। বহু কষ্টে নির্মূল করা হামকে আবারো নিয়ন্ত্রণে আনার কঠিন লড়াইয়ে।