ভারতে বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহিতার দাবিতে এই সপ্তাহে দেশটির তেলাপোকা বা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’-এর ব্যানারে দেশব্যাপী গণবিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন লাখ লাখ ভারতীয় তরুণ। আন্দোলন জোরালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৌশলী অবস্থান নেয়া এবং নীরব থাকার কারণে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছেন ভারতীয় জনপ্রিয় তারকারা।
দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই থেকে দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়া ২৪ বছর বয়সী বিজয় রাই বলেন, ‘আমরাই তাদের চলচ্চিত্র ও ম্যাচের খরচ দিয়ে অর্থ ব্যয় করে তাদের বিখ্যাত ও ধনী করেছি। এখন যথন আমাদেরকে সামান্য সাহায্য করার সময় এসেছে, তাদের কাছ থেকে কিছুই পাচ্ছি না।’
চলমান ককরোচ মুভমেন্টে, যেটিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় জনচ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে সিজেপি সংগঠক ও বিক্ষোভকারীরা তীব্র দাবদাহ, মৌসুমি বৃষ্টি ও অসহনীয় আর্দ্রতার মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০ জুন রাজধানীতে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট শুরু করার পর থেকে মাটিতেই রাত কাটাচ্ছেন।
অবশ্য, এই আন্দোলনের ফলে বড় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। মে মাসের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়, যাতে ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে এবং এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন, যা ছিল সিজেপির অন্যতম প্রধান দাবি। বিজেপির ১২ বছরের শাসনামলে এই প্রথমবার মোদির অন্যতম ঘনিষ্ঠ কোনো মন্ত্রী ক্রমাগত গণচাপের মুখে পদত্যাগ করলেন।
তবে, একসময় রাজনীতির বাইরে বলে বিবেচিত বলিউড এখন সমালোচকদের কাছে মোদির বিজেপি সরকারের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবার শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভের জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং বিক্ষোভকারীদের মতে, পেলেট গান ব্যবহার করলে বিক্ষোভকারীরা তারকাদের
সমালোচনা করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার সময় তাঁরা নীরব থাকলেও আন্তর্জাতিক বিষয়ে খুব কথা বলেন।
অনেক শীর্ষস্থানীয় অভিনেতা, বিশেষ করে মুসলিম তারকারা, সংগঠিত বর্জন বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থান নিয়েেেছন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেসব ভারতীয় তারকা শেষ পর্যন্ত ককরোচ আন্দোলনের নিয়ে মন্তব্য করেছেন, তাদের বেশিরভাগই সরাসরি সরকারের সমালোচনা এড়িয়ে গেছেন। সালমান খান ছাত্রদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতি মোদির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অন্যদিকে, অনুপম খের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রতি সহানুভূতি জানালেও সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক সুযোগ সন্ধানীরা আন্দোলনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, যা বিজেপি মন্ত্রীদের মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। সমালোচিত হয়েছেন আমির খানও। কারণ তিনি দাবি করেছেন যে তাঁর ২০০৯ সালের বহুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘থ্রি ইডিয়টস’ প্রকৌশলী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নয়, যা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বহুল স্বীকৃত বিষয় ছিল।
এদিকে, ওয়াংচুক ‘তেলাপোকা আন্দোলন’-এর সমর্থনে ২৬ দিনের অনশন ধর্মঘট করেছেন এবং অনেকেই এটিকে খানের পক্ষ থেকে এই আন্দোলন থেকে নিজেকে ও নিজের ক্যারিয়ারকে দূরে সরিয়ে রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, সংযত প্রতিক্রিয়ার জন্য সমালোচিত হয়েছেন ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলি, আনুশকা শর্মা এবং শচীন টেন্ডুলকারও। টেন্ডুলকার শুধু লিখেছেন, ‘আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কঠোর পরিশ্রম পুরস্কৃত হবে, সততাকে উৎসাহিত করা হবে এবং যোগ্যতারই জয় হবে।’ একজন প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বলেছেন, অনেক তারকা হয়তো সরকারি বিরোধিতায় গেলে চুক্তি ও বিজ্ঞাপন হারানোর আশঙ্কা করেন।
তিনি এও বলেন, ‘কিন্তু সবচেয়ে বড় তারকারা এতটাই বিখ্যাত যে তাদের সেই পরিচিতিই তাদের সুরক্ষা দেয়, তবুও তারা মুখ খোলেননি।’ তবে, উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, যিনি বলিউডের এই নীরবতার নিন্দা করেছেন, এবং শাবানা আজমি, যিনি এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন। শাবানা দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-কে দেয়া একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘তারা ওদের কথা কেন শুনছে না? আমাদের উচিত
ওদের আশা গড়ে তোলা, ওদের মনোবল চূর্ণ করে দেওয়া নয়।’