জুলাইয়ের সেই সন্ধ্যায় মিউনিখের আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। অলিম্পিক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন হাজার হাজার মানুষের নিঃশ্বাস যেন একসঙ্গে ওঠানামা করছে। পৃথিবীর চোখ আটকে ছিল সবুজ ঘাসের সেই মঞ্চে, যেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল দুই ভিন্ন দর্শন। শৃঙ্খলা ও শক্তির প্রতীক পশ্চিম জার্মানি। আর সৌন্দর্য, স্বাধীনতা ও কল্পনার প্রতীক নেদারল্যান্ডস।
সেদিন শুধু একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল হচ্ছিল না। ফুটবলের অতীত ও ভবিষ্যৎ যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। মাত্র দুই বছর আগে মিউনিখ অলিম্পিকের মঞ্চে ঘটে গিয়েছিল সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড, যা পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তাই বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় পশ্চিম জার্মানির কাঁধে ছিল শুধু একটি টুর্নামেন্ট সফল করার দায়িত্ব নয়, বরং বিশ্বের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।
মিউনিখ, হামবুর্গ, ডর্টমুন্ড, ফ্রাঙ্কফুর্ট, গেলসেনকির্খেন, হ্যানোভার, ডুসেলডর্ফ ফুটবলের একেকটি তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। কোটি কোটি মার্ক ব্যয়ে, বছরের পর বছর পরিকল্পনায়, অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সাজানো হয়েছিল ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ।
সেবারের বিশ্বকাপ ছিল আরেকটি কারণে ঐতিহাসিক। সেই প্রথম মাঠে এসেছিল নতুন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ব্রাজিল তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে জুলে রিমে ট্রফিকে স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেওয়ার পর ফুটবল প্রবেশ করেছিল এক নতুন অধ্যায়ে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ফুটবল বিশ্ব একটি ধাক্কা খেয়েছিল। ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড বাছাইপর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে। পোল্যান্ডের কাছে ওয়েম্বলিতে পয়েন্ট হারিয়ে ইংরেজদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। ফুটবল বুঝতে পারে, পুরোনো সাম্রাজ্যগুলো আর আগের মতো অজেয় নেই।
অন্যদিকে ব্রাজিল এসেছিল এক গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে। পেলে নেই। ফুটবলের রাজা অবসর নিয়েছেন। পৃথিবী জানতে চাইছিল পেলে ছাড়া কি ব্রাজিল এখনও সেই ব্রাজিল?
জবাব খুঁজতে খুঁজতেই শুরু হয় বিশ্বকাপ।
এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে পা রাখে তিন নতুন দেশ- হাইতি, অস্ট্রেলিয়া এবং জাইরে। তারা ট্রফির দাবিদার ছিল না, কিন্তু স্বপ্নের দাবিদার ছিল। ক্যারিবীয় দরিদ্র দ্বীপ হাইতি, কর্মজীবী ফুটবলারদের দেশ অস্ট্রেলিয়া আর আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্বকারী জাইরে তিনটি দেশই বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে ফুটবল শুধু ধনীদের খেলা নয়; এটি মানুষের আশা, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার ভাষা।
হাইতির ফুটবলারদের অনেকেই ছিলেন অপেশাদার। অস্ট্রেলিয়ার দলে ছিলেন দর্জি, প্লাম্বার, কেরানি, গাড়ি বিক্রেতা। জাইরের খেলোয়াড়রা এসেছিলেন সীমাহীন দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাদের চোখে ছিল একই আগুন।
প্রথম রাউন্ড শুরু হতেই বিশ্বকাপ তার নাটকীয় রূপ দেখাতে শুরু করে।
উদ্বোধনী ম্যাচে যুগোশ্লাভিয়া গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয় চার বছর আগের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। পেলের উত্তরসূরিরা তখনও নিজেদের খুঁজছিল।
আয়োজক পশ্চিম জার্মানি শুরু করে জয় দিয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় তৈরি হচ্ছিল অন্য কোথাও।
সেটি ছিল নেদারল্যান্ডস।
যোহান ক্রুইফের নেতৃত্বে ডাচরা যেন ফুটবলকে নতুন ভাষায় লিখছিল। তারা শুধু খেলছিল না, তারা ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছিল। ডিফেন্ডার আক্রমণে যাচ্ছেন, স্ট্রাইকার নেমে আসছেন রক্ষণে, মিডফিল্ডার পুরো মাঠ নিয়ন্ত্রণ করছেন। পজিশনের প্রচলিত ধারণা ভেঙে জন্ম নিচ্ছিল “টোটাল ফুটবল”।
ক্রুইফ ছিলেন সেই বিপ্লবের মুখ। তাঁকে শুধু ফুটবলার বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন একটি আন্দোলন। একটি চিন্তা। একটি নতুন দর্শন।
পোল্যান্ডও হয়ে উঠেছিল টুর্নামেন্টের বিস্ময়। গ্রেজেগোর্জ লাতো, আন্দ্রেজ শারমাখ আর কাজিমিয়ের্জ ডেইনার নেতৃত্বে তারা একের পর এক শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয়।
আর তারপর আসে সেই ম্যাচ, যা ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
পশ্চিম জার্মানি বনাম পূর্ব জার্মানি।
একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই ইতিহাস কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দুই রাষ্ট্র। হামবুর্গের সেই রাতে ফুটবল মাঠ হয়ে উঠেছিল ঠান্ডা যুদ্ধের এক প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্র। জুর্গেন স্পারভাসারের একমাত্র গোলে পূর্ব জার্মানি জিতে যায়।
পরাজিত হলেও ভাগ্য যেন পশ্চিম জার্মানির জন্য অন্য পথ লিখে রেখেছিল।
দ্বিতীয় রাউন্ডে এসে শুরু হয় প্রকৃত লড়াই।
নেদারল্যান্ডস আর্জেন্টিনাকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয়। পূর্ব জার্মানিকে হারায়। তারপর ব্রাজিলকেও ২-০ গোলে পরাজিত করে। ডাচদের ফুটবল দেখে মনে হচ্ছিল ভবিষ্যৎ যেন বর্তমানকে ছাপিয়ে গেছে।
অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছিল। বেকেনবাউয়ারের নেতৃত্ব, সেপ মায়ারের নির্ভরতা এবং গার্ড মুলারের নির্মম গোলক্ষুধা তাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
বৃষ্টিভেজা কাদামাখা মাঠে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১-০ গোলের জয় ছিল তাদের চরিত্রের পরীক্ষা। সেই ম্যাচে সেপ মায়ার যেন মানুষ নন, দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
ব্রাজিলও লড়াই করেছিল। আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল। কিন্তু ডাচ ঝড়ের সামনে তাদের পুরোনো সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। একসময় যে দল ফুটবলের শিল্পের প্রতীক ছিল, তারা বুঝতে পারে নতুন শিল্পী এসে গেছে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পোল্যান্ড ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে। লাতো গোল করে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে দেন।
কিন্তু সব আলো তখন মিউনিখের দিকে। ৭ জুলাই ১৯৭৪। ফাইনালের দিন। খেলা শুরু হওয়ার আগেই যেন বজ্রপাত। মাত্র এক মিনিটের মাথায় ক্রুইফ বল নিয়ে ছুটলেন। জার্মান ডিফেন্ডাররা তাঁকে থামাতে গিয়ে ফাউল করল। পেনাল্টি।নিসকেন্স গোল করলেন।পশ্চিম জার্মানির কোনো খেলোয়াড় তখনও বল স্পর্শ করেনি। স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ।
বিশ্ব বিস্মিত। অনেকেই ভেবেছিল গল্প শেষ।কিন্তু জার্মানরা কখনও এত সহজে হার মানে না।তারা ফিরে আসে।একটি পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান পল ব্রাইটনার। তারপর আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য গার্ড মুলার আজও কিংবদন্তি। এক ঝলক সুযোগ। একটি স্পর্শ। একটি শট গোল। ২-১।ইতিহাস বদলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে বার্টি ফোগ্টস ক্রুইফকে এমনভাবে আটকে রাখেন যে ডাচদের আক্রমণের ধার ভোঁতা হয়ে যায়। নেদারল্যান্ডস বলের নিয়ন্ত্রণ রাখে, সৌন্দর্য দেখায়, কিন্তু গোল খুঁজে পায় না। শেষ বাঁশি বাজতেই মিউনিখ উল্লাসে ফেটে পড়ে। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার নতুন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। পশ্চিম জার্মানি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু এই গল্পের সৌন্দর্য এখানেই,ট্রফি জিতেও জার্মানি একমাত্র নায়ক হয়ে ওঠেনি।
কারণ পরাজিত নেদারল্যান্ডস ফুটবলকে এমন কিছু উপহার দিয়েছিল, যা কোনো ট্রফির চেয়েও বড়। তারা দেখিয়েছিল ফুটবল কেবল জয়ের খেলা নয়, এটি কল্পনারও খেলা। তারা দেখিয়েছিল একজন ডিফেন্ডারও আক্রমণভাগের শিল্পী হতে পারে, একজন স্ট্রাইকারও রক্ষণের সৈনিক হতে পারে। তারা দেখিয়েছিল ভবিষ্যতের ফুটবল কেমন হবে।
তাই ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত সত্য। বিজয়ীর নাম ছিল পশ্চিম জার্মানি।কিন্তু কিংবদন্তির নাম ছিল নেদারল্যান্ডস।
আর সেই কারণেই ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে লেখা এক মহাকাব্য। ট্রফি উঠেছিল বেকেনবাউয়ারের হাতে, কিন্তু ফুটবলের আগামীকাল জন্ম নিয়েছিল ক্রুইফের পায়ের ছোঁয়ায়।