সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ভোটে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তার অবসান ঘটেছে। তবে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়।
বিএনপির বিজয় প্রত্যাশিত হলেও এত বড় ব্যবধানে জয় অনেকের জন্যই বিস্ময়কর ছিল। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে কঠিন লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জনগণের আস্থারই ইঙ্গিত দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এবার এ দলটিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়নি।
বাংলাদেশের ভোটাররা এমন একটি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ দলকে সমর্থন দিয়েছেন, যা অতীতে একাধিকবার দেশ শাসন করেছে এবং হাসিনার শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পরাজয়কে ধর্মভিত্তিক রক্ষণশীল রাজনীতির প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটাররা সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষেও রায় দিয়েছেন। যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং নারীদের অধিক প্রতিনিধিত্ব অন্তর্ভুক্ত।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কখনও বেসামরিক, কখনও সামরিক শাসনের মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দুই নারী নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক পরিবার প্রভাব বিস্তার করেছে। তারা হলেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তারা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন এক সন্ধিক্ষণে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে বিএনপির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কারামুক্তির পর মারা যান। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে আছেন তার পুত্র ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০০৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশত্যাগ করা তারেক রহমান ২০২৪ সালে আগের সরকারের পতনের পর স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন এবং এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি কখনও সরকারি পদে ছিলেন না। জাতীয়তাবাদী ও সংস্কারমুখী এজেন্ডা নিয়ে তিনি দলকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দেন।
তবে তিনি এমন সময় দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশ এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিঘাত থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি। জেন-জি প্রজন্মের বিদ্রোহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পাওয়া সাংবিধানিক সংস্কার প্যাকেজ কিছু সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত দেশটি এ অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে পরিণত হয়। সামাজিক সূচকেও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। রপ্তানির প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প সংকটে রয়েছে। অর্থনীতির মন্থরতা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিপুল যুব জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব সমস্যা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হবে। নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও আওয়ামী লীগ এখনও একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা তার সমর্থকদের সক্রিয়ভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি নির্বাচনকে প্রহসন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ দাবিতে ভারত সাড়া দেবে বলে মনে হয় না, যা দুই দেশের সম্পর্কে একটি জটিল ইস্যু হয়ে আছে।
তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। সমালোচকরা অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশকে ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছেন। হাসিনার পতন নয়াদিল্লির জন্যও বড় ধাক্কা ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বন্ধ করেনি বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে; ঢাকা অভিযোগ করেছে, দিল্লি হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতকদের আশ্রয় দিচ্ছে। নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিলেও পানিবণ্টন ও সীমান্ত-সংঘর্ষসহ কিছু জটিল সমস্যা রয়ে গেছে। জনমতের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব পররাষ্ট্রনীতিকে আরও স্বতন্ত্র করার দাবি জোরদার করেছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। চীন এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বড় বিনিয়োগকারী। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশ চীনের দিকে আরও ঝুঁকেছে। এদিকে হাসিনা সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের সময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়। দুই দেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়িয়েছে এবং সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু করেছে।
নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নতুন প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া সার্ক পুনরুজ্জীবনের কথাও বলেন।
গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাংলাদেশ আঞ্চলিক শান্তির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
(জাহিদ হুসাইন লেখক ও সাংবাদিক। তার এ লেখাটি অনলাইন ডন থেকে অনুবাদ)