গেল বছর পর্যন্ত সরকারের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। ধারাবাহিকভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে চলেছে। গত ১১ বছরে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এই মুনাফার মূল কারণ ছিল বিদেশ থেকে কম দামে জ্বালানি তেলে আমদানি করে দেশে বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি করা।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ২০২৪ ও ২০২৫ বিশ্লেষণ করে তেল বিক্রি করে বিপিসি নিট মুনাফার একটি চিত্র পাওয়া গেছে। ১১ বছরের এই পরিংখ্যানে দেখা যায়, এক বছর বাদে বাকি বছরগুলোতে তেল বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

অর্থনৈতিক সমীক্ষায় পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর থেকে বিপিসি তেল বেঁচে মুনাফা করা শুরু করে। সে বছর প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার পরিমাণ ছিল চার হাজার ১২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর পরের অর্থবছর ২০১৫-২০১৬ তে মুনাফা করেছে ৯ হাজার ৪০ কোটি ৭ লাখ টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে মুনাফা আট হাজার ৬৫৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পরে একইভাবে মুনাফা করেছে, ২০১৭-২০১৮ তে পাঁচ হাজার ৬৪৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০১৮-২০১৯ তে চার হাজার ৭৬৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০১৯-২০২০ তে পাঁচ হাজার ৬৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০২০-২০২১ মুনাফা করেছে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এরপর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে শুধু বিপিসি কোনো মুনাফার মুখ দেখেনি। সেই বছর প্রতিষ্ঠানটির লোকসান গুনতে হয়েছে এক হাজার ৯৮৩ কোটি ৩ কোটি টাকা। এই লোকসানের জন্য বিপিসি অপরিকল্পিত কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নকে দায়ী করা হয়েছে।

এরপর ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিপিসি আবার মুনাফার ধারায় ফিরে আসে। সেই অর্থবছরের প্রতিষ্ঠানটি মুাফার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৫৩ কোটি ৯৫ লাখ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে মুনাফা হয় তিন হাজার ৯৪৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এবং সর্বশেষ গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিপিসির মুনাফা করে দুই হাজার ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

এত মুনাফার পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার তেলের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেছে। বর্তমান সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে গত শনিবার রাত থেকে সব ধরনের তেলের দাম বাড়িয়েছে। লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গত রাতে নয়া দিগন্তে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় হয়তো তেলের দাম সমন্বয়ের দরকার ছিল। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ছিল, ডিজেলের দাম না বাড়িয়ে অকটেন ও পেট্রলের দাম যেন বাড়ানো হয়। কারণ ডিজেল এ দেশের কৃষকসহ ব্যাপক সংখ্যার জনগোষ্ঠী ব্যবহার করেন।

তিনি আরো বলেন, সরকারের বাড়তি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি- তিনটি বিষয় এখন আলোচনায় এসেছে। তবে এ আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। সেটি হলো সব বাড়তি ব্যয়ই লোকসান বা ভর্তুকি নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি আগের মুনাফা বা কাঠামোগত ত্রুটির ফল, যা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রথমেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রসঙ্গটি বিবেচনা করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে অনেকেই লোকসান বা ভর্তুকি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি তা নয়। বিপিসি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করেছে। তাই বর্তমান ঘাটতি বিপিসির জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো বোঝা নয়। প্রতিষ্ঠানটির অতীত মুনাফা থেকেই এ ব্যয় বহন করার সক্ষমতা রয়েছে। এটি বিপিসির উপার্জিত অর্থ, যা মূলত ভোক্তাদের কাছ থেকেই আগে সংগ্রহ করা হয়েছে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর ত্রুটির কারণে ভোক্তাদের প্রায় ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি মূল্য দিতে হয়েছে, যা বিপিসির মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা চুক্তিগুলো ভুল ছিল। সরকার উচিত এই চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেয়া। তা হলে হয়তো তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।

উল্লেখ্য, দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর ৭৩ শতাংশ ডিজেল দ্বারা পূরণ করা হয়। ডিজেলের প্রায় পুরোটায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে অকটেনের চাহিদার অর্ধেকের বেশি এবং পেট্রলের পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়। তাই দেশে উৎপাদিন এই দুই পণ্যের দাম বাড়ানোকে অনেকে অযৌক্তিক এবং অন্যায় বলেছেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews