॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥

বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গত দেড় দশকে যে অপশাসন ও সংহারমুখী রাজনীতির বিস্তার ঘটেছিল, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের বন্দনা এবং সেই পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ক্ষমতার বলয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সেই বন্দনার প্রাসাদকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিয়েছে। পতন ঘটেছে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের। কিন্তু পতনের পর এখন যে প্রশ্নটি রাজনৈতিক অঙ্গন এবং জনপরিসরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো; যে পরিবারের নামে দেশটাকে এক প্রকার নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল, সেই পরিবারের বর্তমান রূপ এবং তাদের তথাকথিত ‘দ্বিতীয় প্রজন্ম’ আসলে কারা? তারা কোথায় আছেন, তাদের নাগরিকদের পরিচয় কী এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও রাজনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটুকু?

বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে; ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী এস্টাবলিশমেন্টের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া বাংলাদেশে ‘আহলে শেখ মুজিব’-এর কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি বা উপযোগিতা আর অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পলাতক অবস্থায় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তার অডিও ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার যে মাতম আমরা দেখছি, তার পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটিই; বাংলাদেশে ভারতের অধিপত্যবাদী ভূরাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখা। বর্তমানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার ক্ষণে ক্ষণে অডিও ক্লিপের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেওয়া কিংবা নানা মাধ্যমে ‘লুকোচুরি খেলা’র যে আহাজারি আমরা দেখছি, তার পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটিই; বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদী স্বার্থকে প্রাসঙ্গিক রাখা। এই পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা মূলত দিল্লির নিজস্ব স্বার্থে, বাংলাদেশের কলকাঠি নাড়ার হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু যে বাংলাদেশের সাধারণ তৃণমূলের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মী আজও ভাবেন তাদের নেত্রী ফিরে এসে তাদের উদ্ধার করবেন, তাদের চোখের ঠুলি খুলে এই পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের নাগরিকত্ব, জীবনধারা ও বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থানের দিকে তাকানো প্রয়োজন। ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের এই শেখ পরিবারের প্রধান অংশটি এখন পুরোপুরি বহিরাগত এবং বৈশ্বিক নাগরিক। বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে, এ দেশের আলো-বাতাসের সঙ্গে কিংবা এ দেশের সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের সংকটের সঙ্গে এদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক বা রাজনৈতিক উপস্থিতি নেই।

১. ফ্যাসিস্ট ও এশিয়ার কুখ্যাত দানব শেখ হাসিনার জ্যেষ্ঠ সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং নিবাস সূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার পড়াশোনা ও জীবনধারা সম্পূর্ণ মার্কিন ঘরানার। তিনি ২০০২ সালে মার্কিন নাগরিক ও শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ক্রিস্টিন এন ওভারমায়ারকে (Kristine Ann Overmire) বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে বা আইনি বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। যিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনকালে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা’ সেজে রাষ্ট্রীয় পদ ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, তার নিজস্ব জীবন ও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি আমেরিকা-কেন্দ্রিক। বাংলাদেশের ভাঙাগড়ার রাজনীতির কোনো সরাসরি আঁচ তার গায়ে লাগেনি।

২. জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কানাডার নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যলয় থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করে সেখানে অবস্থান তৈরি করেছেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন কানাডিয়ান নাগরিক খন্দকার মাশরুর হোসেন মিটুকে (যিনি পরবর্তীতে সাবেক ফ্যাসিস্ট মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে)। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পারিবারিক স্বজনপ্রীতির কেমন নজির এই বিয়েকে কেন্দ্র করে হয়েছিল, তা দেশের মানুষ ভালো করেই জানে। জামাতার যোগ্যতার পুরস্কার হিসেবে মাশরুরের বাবা খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে শেখ হাসিনা সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, যিনি বিপুল অর্থ পাচার ও পরবর্তীতে ফরিদপুরসহ সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এই কানাডিয়ান পুতুল-মাশরুর দম্পতির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল ঢাকার কোর্টে, কিন্তু তাদের দাম্পত্যের অবসান বা ডিভোর্স হয়েছে দুবাইয়ের কোর্টে। এখানেই শেষ নয়, তালাকের পর সাবেক স্বামীর কাছ থেকে সম্পত্তি আদায়ের আইনি লড়াই চলেছে আমেরিকার ফ্লোরিডার আদালতে। সেখানে নগদ তিন কোটি টাকা, দুটি বাড়ি এবং এ যাবৎকালের সব মূল্যবান উপহার আদায়ের মাধ্যমে এই আইনি বোঝাপড়া শেষ হয়। শিক্ষা ও কর্মসূত্রে সায়মা ওয়াজেদ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশের মাটিতেই নিজের অবস্থান সুসংগঠিত করেছেন।

যাদের বিয়ে হয় ঢাকায়, ডিভোর্স হয় দুবাইয়ে, আর সম্পত্তির ভাগাভাগি হয় আমেরিকার ফ্লোরিডায়; বাংলাদেশের সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের ভাগ্য, আবেগ বা রাজনীতির সঙ্গে তাদের দূরত্ব কত আলোকবর্ষের! আর এই জয় ও পুতুলের মা, জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণহত্যা দমনপীড়নের প্রধান হুকুমদাতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এখন বিচার ফেস করার ভয়ে বাংলাদেশে আসতে সাহস পাচ্ছেন না; পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে।

৩. বাকশালী ফ্যাসিস্ট রক্ষীবাহিনী তৈরি করে গণহত্যাকারী শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এবং তার সন্তানদের দিকে তাকালে এই দূরত্বের চিত্রটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেখ রেহানা নিজে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছেন এবং তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তার পুরো পরিবার গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ জীবনধারায়। শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক জন্মসূত্রে ও নাগরিকত্বে একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং যুক্তরাজ্য সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সাবেক জুনিয়র মন্ত্রী। ২০১৩ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক ও শ্বেতাঙ্গ ইহুদী ধর্মাবলম্বী ক্রিস সেন্ট জন-কে (William St John Percy) বিয়ে করেন। টিউলিপের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়, ক্যারিয়ার এবং কর্মজীবন ব্রিটেনের আইন ও সংসদ কেন্দ্রিক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা এ দেশের মানুষের নাগরিক সংকটের সঙ্গে তার কোনো সরাসরি সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই।

৪. শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ফিনল্যান্ডের নাগরিক পেপি সিদ্দিকের (Peppi Kiviniemi-Siddiq) সঙ্গে। তিনি ও তার পরিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান করছেন এবং তাদের জীবনযাত্রার পরিম-ল সম্পূর্ণ পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও রেহানার কনিষ্ঠ কন্যা আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীও যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ধারণ করেন। অর্থাৎ, রেহানার দুই ছেলেমেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ও মুজিব সিদ্দিক ববির স্পাউজ বা জীবনসঙ্গীদের কেউই বাংলাদেশি নন, এমনকি ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকেও এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির অংশ নন। তারা সম্পূর্ণ পশ্চিমা সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠা এবং সেখানেই স্থায়ী হওয়া নাগরিক।

পুরো বংশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এদের একজন সদস্যও স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করেন না। এবং বাংলাদেশের নাগরিকও না তারা। গত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাত, মেগা প্রজেক্ট এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠন ও পাচারের অভিযোগ উঠেছে, তার মাধ্যমে তাদের আন্তর্জাতিক জীবনযাত্রার সুদৃঢ় বন্দোবস্ত নিশ্চিত হয়েছে।

৫. নিষিদ্ধ আওয়ামী তৃণমূলের অন্ধত্ব এবং নির্মম বাস্তবতা হলো; এই গোটা সমীকরণের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনৈতিক কর্মী ও অনুসারীদের জন্য। দেশের অজপাড়াগাঁয়ের যে কর্মীটি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেন বা পারিবারিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন; তিনি আজও স্বপ্ন দেখেন তাদের দলনেত্রী বিদেশ থেকে এসে তাদের উদ্ধার করবেন। তৃণমূলের কর্মীদের অনুধাবন করা উচিত, এই পরিবারের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের কেউ এ দেশের মাটিকে নিজেদের বাসস্থান মনে করে না। অথবা তারা কেউ এই বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়ায়; এ দেশের সম্পদ তাদের কাছে ক্ষমতার উৎস ও উপযোগিতা ছিল মাত্র। যখনই সংকট এসেছে, তারা তাদের বিদেশি পাসপোর্ট পকেটে নিয়ে নিজ নিজ নিরাপদ আশ্রয়ে; ভারতে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য কিংবা ফিনল্যান্ডে চলে গেছেন। আর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নিজে অবস্থান নিয়েছেন ভারতে।

পরিশেষে, যাদের পুরো পরিবারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পশ্চিমা দুনিয়ায় এবং বিদেশে সুরক্ষিত, তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক কর্মীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন। দিল্লির ভূরাজনৈতিক স্বার্থে যখন কিছু অডিও বার্তা বা রাজনৈতিক বার্তা বাজারে ছাড়া হয়, তখন দেশের ভেতরের অন্ধ অনুসারীরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছেন। সুতরাং, ‘আহলে শেখ মুজিব’-এর এই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সম্পূর্ণ অ-বাংলাদেশি ও বহিরাগত অবস্থানটি আজ স্পষ্ট প্রমাণিত। এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কিংবা সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে এদের কোনো বাস্তব উপস্থিতি বা উপযোগিতা নেই। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক সমাজকে আন্তর্জাতিক সমীকরণ ও এই বংশতালিকার বাস্তব রূপটি অনুধাবন করে এগোতে হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews