কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ (সিএমএসএমই) খাতে ব্যাংক ঋণ কমেছে। ফলে এ খাতের ব্যবসায়ের পরিধি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এটা যেকোন বিচারেই উদ্বেগজনক। গত জুন প্রান্তিক শেষে সিএমএসএমই খাতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল মোট ঋণের ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গত দু’বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সিডিউল ব্যাংকগুলোকে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। সিএমএসএমই খাতে দেয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিংয়ের হার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট প্রদত্ত ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে তা ২৭ শতাংশে উন্নীত করতে বলা হয়েছে। কিন্তু অবস্থা যেভাবে অবনতি ঘটছে তাতে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবার কোন সম্ভাবনা নেই বলেই অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক কুটির শিল্পে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ লাখ,মাইক্রো উদ্যোগে ২ কোটি টাকা,ক্ষুদ্র উদ্যোগে ২৫ কোটি টাকা এবং মাঝারি উদ্যোগে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দান করা যাবে। নারীদের ক্ষেত্রে বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকা এবং অন্য উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ দেয়া যাচ্ছে। গত জুন মাসের পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল সিএমএসএমই খাতে। ২০২৩ সালে মোট ব্যাংক ঋণের ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ ছিল সিএমএসএমই খাতে। সিএমএসএমই খাতে ঋণদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। সিএমএসএমই খাতে যেসব শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে তার প্রায় সবই ব্যক্তি মালিকানায়। সিএমএসএমই শিল্পের একটি বড় অংশ হস্তশিল্পজাত পণ্য। বিশ্ববাজারে হস্তশিল্পের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে হস্তশিল্পের বাজার ছিল ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩২ সাল নাগাদ তা আড়াই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতে কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সিএমএসএমই খাত পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। এ খাতটি কার্যত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। উন্নত দেশগুলোতে সিএমএসএমই খাতকে শিল্পায়নের ভিত্তি বা সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি অর্জন করেছে তাদের জিডিপি’তে সিএমএসএমই খাতের অবদান ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। যেমন ভারতের জিডিপি’তে সিএমএসএমই খাতের ৩৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪০শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৩৯দশমিক ১০ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪৫শতাংশ, চীনে ৬০ শতাংশ, জাপানে ৫০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৬ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে এর হার ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান ৩০ শতাংশের মতো। বাংলাদেশে শিল্প খাতে যে কর্মসংস্থান হয় তার ৮০ শতাংশই হয় সিএমএসএমই খাতে। বাংলাদেশে সিএমএসএমই খাতের ওপর অতীতে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ নেয়া হলে তা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বৃহৎ শিল্পের উপর যতটা গুরুত্ব দেয়া হয় তার অর্ধেকও যদি সিএমএসএমই খাতে দেয়া হতো তাহলে অনেক আগেই দেশ শিল্পায়িত হয়ে যেতো।
মনে রাখতে হবে, চেষ্টা করলে ভালো কর্মী হওয়া যায় কিন্তু সবাই উদ্যোক্তা হতে পারেন না। উদ্যোক্তা হতে হলে বিশেষ কিছু কোয়ালিটি থাকতে হয়। একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় গুন বা কোয়ালিটি হচ্ছে ঝুঁকি গ্রহণের সাহস এবং সক্ষমতা। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভালো ধারনা থাকতে হয়। এসব গুন একদিনে বা রাতারাতি সৃষ্টি হয় না। দীর্ঘ দিন অনুশীলনের মাধ্যমে এ গুনগুলো অর্জন করতে হয়। যদি উপযুক্ত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে তারা উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে গতানুগতিক ধারায় চলতে পছন্দ করেন। যেমন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এখন কোন বৃহৎ উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপনের চিন্তা করলে প্রথমেই গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করেন। কিন্তু গার্মেন্টস কারখানার চেয়েও লাভজনক শিল্প স্থাপন করা সম্ভব হলেও তারা সে ঝুঁকি নিতে চান না। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশ অত্যন্ত ভালো করেছে এটা ঠিক কিন্তু এ শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে অন্য অনেক শিল্পের চেয়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। প্রতি বছর তৈরি পোশাক সামগ্রি রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে পুনরায় বিদেশে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই শিল্পে মূল্য সংযোজন ঘটে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমরা হয়তো যোগান দিতে পারবো না। কিন্তু স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য যোগান দেয়া সম্ভব এমন শিল্পতো স্থাপন করা যেতে পারে। যেমন আমরা যদি তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, ফল প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ইত্যাদি উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারি তাহলে এসব শিল্প থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে পারে। স্থানীয় কাঁচামাল নির্ভর পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকগণও এতে লাভবান হতে পারবেন। সাধারণভাবে পাকা আম রপ্তানি করা হলে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা সম্ভব তার চেয়ে অন্তত ৫গুন বেশি অর্থ আয় করা সম্ভব যদি আম প্রক্রিয়াজাতকরণের পর রপ্তানি করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য কোন ধরনের শিল্প স্থাপন করা বেশি যৌক্তিক সে ব্যাপারে আমরা জাতীয়ভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। অর্থাৎ আমরা কী শুধু বৃহৎ শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করবো নাকি ক্ষদ্র শিল্পের উপরও সমভাবে গুরুত্বারোপ করবো? আমাদের দেশের উদ্যোক্তাগণ বৃহৎ শিল্প স্থাপনের প্রতিই বেশি আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। সিএমএসএমই শিল্পের প্রতি এক ধরনের অবহেলা প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, বৃহৎ শিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে কোন দ্বন্দ নেই। একই সঙ্গে দু’ধরনের শিল্প বিকশিত হতে পারে। বৃহৎ শিল্পের উদ্যোক্তাগণ একটি প্রোডাক্ট শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের কারখানাতেই উৎপাদন করতে চান। এটা করতে গিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। এর পরিবর্তে তারা যদি ক্ষুদ্র কারখানা থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুক্তির মাধ্যমে তৈরি করে এনে মূল কারখানায় সংযোজন করতেন তাহলে কাজটি তুলনামূলক সহজ হয়ে যেতো। জাপানের টয়োটা কোম্পানিতে প্রয়োজনীয় সব য়ন্ত্রাংশ তৈরি করা হয় না। তারা বাইরের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে চুক্তির মাধ্যমে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা সংযোজন করে বাজারজাত করে। যেমন গাড়ির টায়ার কোন এক কোম্পানি থেকে তৈরি করে আনা হলো। সিট অন্য কোম্পানি থেকে তৈরি করে আনা হলো। গাড়িতে ব্যবহারযোগ্য কাঁচ আর একটি কোম্পানি থেকে তৈরি করে আনা হলো। এভাবে বিভিন্ন ছোট ছোট কোম্পানি থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ অর্ডার দিয়ে তৈরি করে এনে মূল কারখানায় সেগুলোকে সংযোজন করা হয়। এতে দেশটিতে ক্ষুদ্র্র ও মাঝারি শিল্প বিকশিত হবার সুযোগ পাচ্ছে। জাপানি উদ্যোক্তাগণ ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশে সহায়তা করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে করেন। কিন্তু আমাদের উল্টোটিই প্রত্যক্ষ করা যায়। বৃহৎ শিল্পের উদ্যোক্তাগণ ক্ষুদ্র শিল্পকে তাদের প্রতিযোগি মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে এমন সব মার্কেটিং পলিসি গ্রহণ কর হয় যাতে ক্ষুদ্র শিল্প বিকশিত হবার পরিবের্ত ধ্বংস হয়ে যায়।
বাংলাদেশের উদ্যোক্তাগণ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং সৃজনশীল শক্তির অধিকারি। কিন্তু তারা বিকশিত হবার যেমন একটা সুযোগ পাচ্ছেন না। সিএমএসএমই খাতের বিকাশের জন্য জাতীয়ভাবে কার্যকর এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রথমেই উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। কারণ যে কোন কাজের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। আমরা অবশ্যই বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা করবো তবে বৃহৎ শিল্পের সূচনা ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে হওয়াটাই কাঙ্খিত। সবাই ইচ্ছে করলেই বৃহৎ শিল্প স্থাপন করে সফল হতে পারেন না। তাই তারা যদি বৃহৎ শিল্প স্থাপনের আগে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলে দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাহলে তাদের সফল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অর্থায়ন প্রাপ্তির অপ্রতুলতা। প্রচলিত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও আগ্রহী এবং আন্তরিক নয়। তারা জামানত ছাড়া ঋণ প্রদান করে না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ ব্যাংকের চাহিদা মতো জামানত দিতে পারেন না।
বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাগণ জামানত দেবার ক্ষেত্রে বেশি সমস্যায় পড়েন। তারা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে নানা জটিলতায় ভুগেন। তাই চাইলেই তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য জামানত দিতে পারেন না। এছাড়া ব্যাংকের ঋণদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা আছে। হয়তো কোন একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য ঊর্ধ্ব ঋণ সীমা ৫ লাখ টাকা। তাকে ৫ লাখ টাকাই ঋণ নিতে হবে। কিন্তু তার হয়তো ৩ লাখ টাকাতেই কাজটি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে তিনি উদ্বৃত্ত যে ২ লাখ টাকা হাতে পাবেন তা কিভাবে ব্যয় করা হবে তার কোন নির্দেশনা নেই। আবার যার হয়তো ১০ লাখ টাকা ঋণ দরকার তাকে দেয়া হয় ৫ লাখ টাকা। ফলে চাহিদাকৃত অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকার জন্য তাকে অন্য কোন সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। তারা বিকল্প হিসেবে এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। এনজিওদের দেয়া ঋণের সুদের হার প্রচলিত ব্যাংক ঋণের সুদের তুলনায় দুই থেকে তিন গুন। সরকারের অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ মহল দুর্নীতি ও অসততার কারণে ভেস্তে যায়। এ ক্ষেত্রে বিগত সরকার আমলে ‘কৃষি ও পল্লি ঋণ’ নামে এক বিশেষ ঋণদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি ভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলা।
প্রতি বছর বাংলাদেশ ব্যাংক সিডিউল ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিতো। কোন ব্যাংক যদি লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ঋণদান করতে ব্যর্থ হতো তাহলে অব্যবহৃত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে যেতো এবং সুদবিহীন অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করতো। পরবর্তী বছর সে ব্যাংকের রেটিং খারাপ হয়ে যেতো এবং নতুন শাখা খোলার বিষয়ে আপত্তি জ্ঞাপন করা হতো। কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার প্রচলিত ব্যাংক ঋণের সুদের হারের চেয়ে এক শতাংশ কম। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ ঋণ দেয়া যেতো। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ ঋণদান কার্যক্রমে নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন (এনজিও)দের সম্পৃক্ত করে। ফলে পুরো ঋণদান কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে পড়ে। সিডিউল ব্যাংকগুলো ইচ্ছে করলে এনজিও’র হোল সেল লিঙ্কেজে ঋণ দিতে পারে। এনজিওদের কৃষি ও পল্লি ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোন সীমা নির্ধারিত নেই। অর্থাৎ একটি এনজিওকে ২০ কোটি ৪০ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।
এনজিওগুলো প্রচলিত ব্যাংক ঋণের সুদের হারের চেয়ে এক শতাংশ কম সুদে এ ঋণ গ্রহণ করতে পারে। এনজিওগুলো তৃণমূল পর্যায়ে ঋণদানের ক্ষেত্রে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) নির্ধারিত সুদ হার আরোপ করতে পারে। এমআরএ নির্ধারিত সুদ হার হচ্ছে ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ সিডিউল ব্যাংকের ঋণের সুদ হার যখন সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ ছিল তখন সেই ঋণ এনজিওগুলো ২৪ শতাংশ সুদে তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করতে পারতো। সিডিউল ব্যাংকগুলো তাদের নির্ধারিত টার্গেট পূরণের জন্য এনজিওর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণ করতো। ফলে এই ঋণদান কার্যক্রম সুফল দিতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার ৫০ শতাংশ এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণ করতে পারছে।
সরকার ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে কোন লাভ হবে না। বরং সিডিউল ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণ বিতরণের জন্য বাধ্য করা যেতে পারে।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার।